প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রিপাবলিকান দলীয় প্রাইমারি নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীর কাছে কংগ্রেসম্যান টমাস ম্যাসির পরাজয়। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি সাবেক নেভি সিল সদস্য এড গ্যালরিনের কাছে হেরে যান, যা সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর রাজনৈতিক প্রভাবের আরেকটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের নীতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে তিনি জেফরি এপস্টাইন–সংক্রান্ত বিচার বিভাগীয় নথি প্রকাশের দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের বিরোধিতা করেন। এসব অবস্থান ট্রাম্পের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী এড গ্যালরিন ছিলেন ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থী, যিনি সামরিক পটভূমি এবং শক্ত অবস্থানের কারণে দলীয় সমর্থন দ্রুত অর্জন করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তাকে ঘিরে ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও দাতব্য গোষ্ঠীর বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তার অভিযোগও উঠে এসেছে।
সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে গ্যালরিন ৫৪.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে ম্যাসি পান ৪৫.১ শতাংশ ভোট। প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের প্রচারণা ব্যয়ে এই নির্বাচন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল প্রাইমারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু একটি আসনের পরিবর্তন নয়, বরং রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের প্রভাব কতটা বিস্তৃত তা আবারও প্রমাণ করেছে। অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দলের ভেতরে ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান নেওয়া নেতাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।
এর আগেও একই ধরনের ফল দেখা গেছে অন্যান্য রাজ্যে। লুইজিয়ানার সিনেটর বিল ক্যাসিডিওসহ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের কারণে প্রাইমারিতে পরাজিত হয়েছেন। এসব ঘটনাকে দলীয় রাজনীতির শক্তিশালী পুনর্গঠন হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ম্যাসি তার নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকান দলের গুরুত্বপূর্ণ কর ও ব্যয় সংক্রান্ত প্রস্তাব ‘বিগ বিউটিফুল বিল’-এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি যৌথভাবে এপস্টাইন ফাইলস প্রকাশের দাবিও সামনে আনেন, যা তাকে দলের একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় করলেও ট্রাম্পপন্থী শিবিরের সঙ্গে সংঘাত বাড়ায়।
ইরান নীতি এবং সামরিক সহায়তা ইস্যুতে তার অবস্থানও ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধকে তীব্র করে তোলে। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ম্যাসিকে “খারাপ লোক” বলে মন্তব্য করেন এবং তার পরাজয়কে ন্যায্য বলে অভিহিত করেন।
তবে ম্যাসির পরাজয়কে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, এটি মূলত দলীয় সংগঠন, তহবিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের লড়াই, যেখানে ট্রাম্প-সমর্থিত নেটওয়ার্ক কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনও এই নির্বাচনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রিপাবলিকান জিউইশ কোয়ালিশন, আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সুপার প্যাক মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করা হয়েছে ম্যাসির বিরুদ্ধে প্রচারণায়।
পরাজয় স্বীকার করে দেওয়া বক্তব্যে ম্যাসি বলেন, তিনি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই লড়াই শেষ পর্যন্ত নীতির দিক থেকে একটি অবস্থান তৈরি করেছে, যদিও নির্বাচনী ফল তার বিপক্ষে গেছে।
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রাইমারি নির্বাচন আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে দলীয় শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা।
অন্যদিকে, একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আরও প্রাইমারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের প্রার্থীরা অংশ নেন। এই ফলাফলগুলো আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে টমাস ম্যাসির পরাজয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, ট্রাম্পের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।