প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ নিলামে ছয়টিরও বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সাড়ে আট কোটি মার্কিন ডলার কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাজার থেকে মোট ৬০৬ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬.০৬ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করা হয়েছে। শুধু মে মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনেছে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৯ মে) মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতিতে এই ডলার কেনা হয়। এদিন প্রতি ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট এবং কাট-অফ রেট নির্ধারিত হয় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। বাজারে দরপতন রোধ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে ডলারের দর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। একই সঙ্গে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয় বাড়ার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকগুলোতে ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে ডলারের প্রবাহ বেড়েছে, যা বিনিময় বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২২ সালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। তখন ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২২ টাকায় পৌঁছে যায়। ওই সময় বাজার স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে চাপ সৃষ্টি হয়।
পরবর্তী কয়েক বছরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করেছে। গত তিন অর্থবছরে মোট প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বাজারে ছাড়তে হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ২০২১–২২ অর্থবছরে ৭.৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১২.৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি পূর্বের অবস্থার ঠিক বিপরীত। আগে যেখানে ডলারের সংকট ছিল, এখন সেখানে সরবরাহ বেশি হওয়ায় দরপতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন উল্টো পথে গিয়ে বাজার থেকে ডলার কিনে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ, যা স্বল্পমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ও আমদানি খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার জমা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কেনা বা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। লক্ষ্য থাকবে বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করা।
সব মিলিয়ে, ডলার বাজারে চলমান এই হস্তক্ষেপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাজার স্থিতিশীলতা রক্ষার চেষ্টা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই আগামী দিনে দেশের বৈদেশিক মুদ্রানীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।