শেয়ারবাজারে মার্জার নিয়ন্ত্রণে নতুন যুগে বিএসইসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
  • ১২ বার
শেয়ারবাজারে মার্জার নিয়ন্ত্রণে নতুন যুগে বিএসইসি

প্রকাশ: ২৪ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর একীভূতকরণ (মার্জার) ও অধিগ্রহণ (অ্যাকুইজিশন) প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যে আইনি শূন্যতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল, তা দূর করতে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন)। প্রথমবারের মতো এ ধরনের করপোরেট পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গতকাল শনিবার ‘বিএসইসি (করপোরেট রিস্ট্রাকচারিং) রুলস, ২০২৬’ নামে একটি খসড়া বিধিমালা জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি অন্য তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা অধিগ্রহণে গেলে এখন থেকে শুধুমাত্র শেয়ারহোল্ডার ও হাইকোর্টের অনুমোদন যথেষ্ট হবে না, বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে। আগামী ৭ জুন পর্যন্ত এ খসড়া নিয়ে অংশীজনদের মতামত আহ্বান করা হয়েছে।

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন এই প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট নীতিমালার অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা গেছে। কোম্পানির মূল্যায়ন, শেয়ার বিনিময় হার নির্ধারণ এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষার বিষয়গুলো প্রায়শই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে একটি কাঠামোবদ্ধ ও আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি করপোরেট পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে প্রথমে তা পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন নিতে হবে। এরপর ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে পর্যবেক্ষণের জন্য জমা দিতে হবে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ পাওয়ার পরই বিষয়টি বিশেষ সাধারণ সভা বা ইজিএমে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা যাবে।

এ ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডার অনুমোদনের শর্তও কঠোর করা হয়েছে। উদ্যোক্তা, পরিচালক এবং ৫ শতাংশের বেশি শেয়ারধারী বিনিয়োগকারীদের বাদ দিয়ে উপস্থিত সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অন্তত ৭৫ শতাংশের সম্মতি প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, চূড়ান্ত ধাপে হাইকোর্টের অনুমোদনও নিতে হবে।

বিধিমালায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সম্পদ মূল্যায়নের প্রক্রিয়া। শেয়ার বিনিময় অনুপাত বা কনভারশন রেট নির্ধারণে এখন থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কমিশনের নির্ধারিত প্যানেলভুক্ত অডিট ফার্ম বা মার্চেন্ট ব্যাংকারদের মাধ্যমে এই মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে।

মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একটি কোম্পানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে তার আয়, নগদ প্রবাহসহ মৌলিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিবেচনা করে অভ্যন্তরীণ বা অ্যাবসলিউট ভ্যালুয়েশন পদ্ধতি এবং একই খাতের অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ বা রিলেটিভ ভ্যালুয়েশন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এতে করে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় একক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ নিশ্চিত করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, মার্জার বা অধিগ্রহণের ফলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তার একটি পৃথক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। পাশাপাশি যারা প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের বিপক্ষে মত দেবেন, তাদের তালিকাও কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিনিয়োগকারীদের অবস্থান মূল্যায়ন সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো উন্নত বাজারে করপোরেট পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ ও তদারকির আওতায় থাকে। সেখানে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা নির্দিষ্ট বিচারিক সংস্থা দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে, যা দীর্ঘসূত্রতা কমায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। বাংলাদেশেও একই ধরনের শক্তিশালী কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে।

নতুন উদ্যোগকে বাজার সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। অনেকের মতে, শুধু বিধিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কমিশনের সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। অতীতে কিছু মার্জার ও অধিগ্রহণে জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।

ব্রোকারেজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকিং খাতের অনেক কর্মকর্তা নতুন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই করপোরেট পুনর্গঠনে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছিল। নতুন কাঠামো সেই অনিশ্চয়তা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে ডিলার ও ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ’র নেতারা মনে করেন, নতুন বিধিমালা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে কমিশনকে আরও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে না পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে করপোরেট পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। এটি বাস্তবায়িত হলে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সফলতা নির্ভর করবে এর যথাযথ প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত