প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ ৩৬ দিনের টানা আন্দোলন, সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের যে ঘটনা ঘটে, তার প্রভাব এখনো সমাজ, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার নানা স্তরে দৃশ্যমান। আন্দোলনের সময় প্রাণ হারান হাজারের বেশি মানুষ, আহত হন বহু হাজার নাগরিক। সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিলেও, একই সঙ্গে সামনে আসছে উদ্বেগজনক আরেক বাস্তবতা—ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিস্তার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে এমন বহু তথ্য, যা শুধু বিচারপ্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আতঙ্কও তৈরি করছে। কোথাও আহত ব্যক্তিকে দেখানো হয়েছে গুলিবিদ্ধ, অথচ শরীরে গুলির কোনো চিহ্নই নেই। কোথাও জীবিত মানুষকে মৃত দাবি করে মামলা করা হয়েছে। আবার এমন ঘটনাও মিলেছে, যেখানে মামলার বাদী নিজেই জানেন না তার মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর একটি মামলা নিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, আন্দোলনের সময় রিমন নামে এক যুবককে ৪০টি গুলি করা হয়েছিল। তার বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো গুলির আলামত পায়নি। চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের তথ্য বিশ্লেষণ করেও অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
শুধু এটিই নয়, ধানমন্ডি এলাকার আরেকটি মামলায় তদন্তকারীরা খুঁজে পাননি কথিত আহত ব্যক্তির অস্তিত্ব। অভিযোগপত্রে যার নাম উল্লেখ ছিল, তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র, চিকিৎসা নথি কিংবা স্থানীয় পরিচয় পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ীর আরেক মামলায় একজন জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে মামলা দায়েরের তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনরোষের সুযোগ নিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর জন্য এসব মামলা ব্যবহার করেছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, এমন কিছু মামলা আদালতে এসেছে যেখানে বাদী হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি কাউকে আসামি করেননি। অথচ মামলার নথিতে বহু ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার ভাষায়, “বাদীই জানেন না আসামি কারা। এমনকি যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের অনেককে বাদী চিনেনও না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আসামির তালিকা তৈরি করল কে?”
আরেক আইনজীবী তরিকুল ইসলাম জানান, একই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটেছে। তার মতে, “অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নিরীহ মানুষকে জড়ানো হয়েছে। তদন্তে গিয়ে এসব অসঙ্গতি ধরা পড়ছে।”
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তদন্ত করা ১৬৫টি মামলার মধ্যে অন্তত ৩১টি মামলা ভুয়া বা ভিত্তিহীন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া ১১১টি মামলায় মোট ৯ হাজার ৬৯১ জনকে আসামি করা হলেও, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে মাত্র ৩ হাজার ৭৭০ জনের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার ভুয়া মামলা শনাক্তে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের সুনির্দিষ্টতা ছাড়া কাউকে গ্রেফতার না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে, শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সরকার সচেতন।”
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও পুলিশ অনেক সময় জনচাপের মুখে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন ঘিরে মানুষের আবেগ ও ক্ষোভ এতটাই প্রবল যে, কোনো মামলায় কাউকে অব্যাহতি দেয়া হলে তা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “জুলাই আন্দোলন ছিল আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থেকে উৎসারিত একটি গণআন্দোলন। কিন্তু যদি সেই আন্দোলনের আবেগকে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়, তাহলে সেটি পুরো আন্দোলনের নৈতিক অবস্থানকেই দুর্বল করে দেয়।” তিনি আরও বলেন, পুলিশের ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ থাকায় অনেক কর্মকর্তা নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পান না। থানায় হামলা, আদালত ঘেরাও বা সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের আশঙ্কাও তাদের কাজকে প্রভাবিত করছে।
সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ্ মনে করেন, দেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি এবং বিচারহীনতার অভ্যাস এমন পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। তার মতে, “নিরীহ মানুষকে ঢালাওভাবে গ্রেফতার করা বা মামলায় জড়ানোর প্রবণতা নতুন নয়। তবে জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এটি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ব্যবসায়ও পরিণত করেছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মতো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সমাজে প্রতিশোধের মনোভাব, বিভ্রান্তি এবং ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যদি বিচারব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পথও জটিল হয়ে পড়ে। এতে শুধু নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হন না, বরং প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারও বিলম্বিত হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিটি মামলার নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিটি সময়েই এমন অপব্যবহার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি ছিল ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। সেই আন্দোলনের চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে বিচারপ্রক্রিয়াকে হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রমাণনির্ভর—এমন মতই এখন সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসছে।