ঈদে ভোমরা বন্দরে ৭ দিন বন্ধ থাকবে বাণিজ্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ২৩ বার
ঈদে ভোমরা বন্দরে ৭ দিন বন্ধ থাকবে বাণিজ্য

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দরে টানা সাত দিনের জন্য বন্ধ থাকছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বন্দরে সাময়িক বিরতি দেশের ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ২৫ মে থেকে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত ভোমরা স্থলবন্দরের সব ধরনের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এই সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নিয়েছে সাতক্ষীরার ভোমরা সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন এবং ভারতের ঘোজাডাঙ্গা সিএন্ডএফ এজেন্ট কার্গো ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের পারস্পরিক আলোচনা এবং ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের সুবিধা বিবেচনায় এনে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

ভোমরা স্থলবন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বিশেষ করে ভারত থেকে পেঁয়াজ, ফল, মসলা, চাল, বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানিতে এই বন্দর দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকেও বিভিন্ন পণ্য ভারতে রফতানি হয় এই রুট ব্যবহার করে। প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী ট্রাক ভোমরা-ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সচল রাখে। ফলে সাত দিনের এই বিরতি বন্দর এলাকায় সাময়িক স্থবিরতা তৈরি করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুছা জানিয়েছেন, ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব হওয়ায় ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারিবারিক সময় কাটানোর সুযোগ করে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতি বছরই ঈদ উপলক্ষে সীমিত সময়ের জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এবারও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত আমদানি-রফতানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিষয়টি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, এই সময়ে বন্দরে পণ্য ওঠানামা, ট্রাক প্রবেশ, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং অভ্যন্তরীণ লোড-আনলোড কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। তবে ছুটি শেষে আগামী ১ জুন সোমবার থেকে পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হবে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের অনেকেই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন, যাতে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব না পড়ে।

বন্দর সংশ্লিষ্ট পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে অবশ্য এই ছুটিকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক চালক ও শ্রমিক পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পাওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘ বিরতিতে তাদের আয় কমে যাবে। কারণ ভোমরা বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহন কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল হাজারো শ্রমিক প্রতিদিনের আয়ের ভিত্তিতে জীবনযাপন করেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের আগে সাধারণত বাজারে পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। তাই ছুটির কারণে যেন বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতীয় পেঁয়াজ, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের ওপর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাজার অনেকাংশে নির্ভরশীল। তবে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, যেহেতু আগেই ছুটির ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তাই বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ভোমরা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের অফিসার ইনচার্জ তুফান মণ্ডল জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও দুই দেশের বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসাধারী যাত্রীদের যাতায়াত স্বাভাবিক থাকবে। চিকিৎসা, ব্যবসা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা পর্যটনের উদ্দেশ্যে যেসব যাত্রী নিয়মিত এই সীমান্ত ব্যবহার করেন, তাদের চলাচলে কোনো বাধা থাকবে না। সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই কার্যকর থাকবে বলেও তিনি জানান।

ভোমরা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মামুন কবীর তরফদার বলেন, “ঈদের ছুটির সময় বাণিজ্যিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে। যাতে ছুটি শেষে দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালু করা যায়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে ভোমরা কাস্টমস হাউসের কমিশনার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি ছুটি ছাড়া কাস্টমসের দাপ্তরিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জরুরি যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, “বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কাস্টমসের কিছু অফিসিয়াল প্রক্রিয়া চলমান থাকবে, যাতে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যায়।”

সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সীমান্ত বন্দরগুলো দেশের আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ভোমরা বন্দর সাতক্ষীরা ও আশপাশের জেলাগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন এবং কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ফলে টানা সাত দিনের বিরতিতে সাময়িক অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হলেও, ঈদ-পরবর্তী সময়ে দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

স্থানীয় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্রাক পার্কিং, গুদাম এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও বন্দরের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। প্রতিদিন শত শত ট্রাকচালক ও শ্রমিকের আনাগোনায় বন্দর এলাকা সরগরম থাকে। ছুটির সময়ে সেই ব্যস্ততা কমে গিয়ে এলাকায় কিছুটা নীরবতা নেমে আসবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তবে ঈদের আমেজে এই বিরতি অনেকের কাছেই স্বস্তিরও কারণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বাণিজ্য বর্তমানে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভোমরা, বেনাপোল, আখাউড়া কিংবা বাংলাবান্ধার মতো স্থলবন্দরগুলো শুধু পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই এসব বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মানবিক দিক বিবেচনায় উৎসবকেন্দ্রিক ছুটিও প্রয়োজনীয়।

ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে ভোমরা বন্দরে সাময়িক বিরতি এলেও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ছুটি শেষে আবারও পুরোদমে শুরু হবে সীমান্ত বাণিজ্য। ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং স্থানীয় অর্থনীতি নতুন উদ্যমে ফিরে পাবে স্বাভাবিক গতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত