আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশে

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (International Monetary Fund) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন একটি বহুবছর মেয়াদি ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সহায়তার প্রবাহে নতুন দিক নির্দেশনা দিতে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান কর্মসূচির অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এই নতুন কাঠামোর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসেছে। সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান কর্মসূচির অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো নিয়ে দুই পক্ষই গঠনমূলক মতবিনিময় করেছে বলে জানানো হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে সরকার আইএমএফকে তাদের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানায় এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত পদক্ষেপের বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়।

সরকারি পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান আইএমএফ কর্মসূচি এমন এক সময়ে গ্রহণ করা হয়েছিল যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে কিছু কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়।

অর্থমন্ত্রী বৈঠকে উল্লেখ করেন, সরকার সংস্কার থেকে পিছিয়ে যেতে চায় না। বরং দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এবং বাস্তবসম্মতভাবে সংস্কার বাস্তবায়নের পক্ষে। তিনি বলেন, “নতুন সরকারের অধীনে একটি তিন বছরের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কারগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।”

আইএমএফের পক্ষ থেকেও নতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

দুই পক্ষের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নতুন কর্মসূচির কাঠামো। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে। ওই সফরে ঋণের পরিমাণ, শর্তাবলি, সংস্কার কাঠামো এবং অর্থছাড়ের সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে International Monetary Fund–এর সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছিল, যা পরে বেড়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার অর্থছাড় পেয়েছে। বাকি অর্থ ছাড়ের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়, কর কাঠামো সংস্কার, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় আইএমএফ কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে ভ্যাট নীতি, কর অব্যাহতি কমানো এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর মতো ইস্যুগুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক এই সংস্থার সহায়তা শুধু অর্থের উৎস নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে আস্থার প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থার কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন কর্মসূচি সফলভাবে চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশ একটি “কমফোর্ট লেটার” পেতে পারে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহায়তা প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হবে।

তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন কর্মসূচি সফল করতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। না হলে ঋণ সহায়তা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ থেকেই যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আসন্ন আলোচনায় সরকার কতটা বাস্তবসম্মত শর্তে একটি টেকসই ও কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত