প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ও শিশু মৃত্যুর উদ্বেগের মধ্যেই টিকাদান কর্মসূচিতে বড় সাফল্যের দাবি করেছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় হামের টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২২ শতাংশ অর্জন হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত দুই কোটিরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, যেসব উপজেলায় প্রথম ধাপে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল, সেখানে সংক্রমণের হার প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
সোমবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুমিল্লা সদর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী Sardar Md. Shakhawat Hossain। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে হাসপাতালগুলোতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্যই এই আকস্মিক পরিদর্শনে যান তিনি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু মৃত্যুর কিছু ঘটনা সামনে আসার পর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, টিকাদান কাভারেজ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে হামের টিকাদান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো কোনো শিশুকে যেন প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রাণ হারাতে না হয়। তাঁর ভাষায়, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে হামে আক্রান্ত শিশুদের রক্ষা করা এবং কোনো মায়ের বুক যেন সন্তান হারানোর বেদনায় খালি না হয়, তা নিশ্চিত করা।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যে পরিস্থিতির মানবিক দিকটিও উঠে আসে, যা সাম্প্রতিক সংক্রমণ পরিস্থিতির গভীরতা নির্দেশ করে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা World Health Organization-এর কাছে স্বাধীন তদন্ত চাওয়ার প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলমান টিকাদান ক্যাম্পেইনে দেশের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেখানে আগে টিকাদানের হার কম ছিল কিংবা সংক্রমণ বেশি দেখা গিয়েছিল, সেখানে বাড়তি নজরদারি চালানো হচ্ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশাসনের সমন্বয়ে পরিচালিত এই কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা না পেলে শিশুদের নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে অতীতে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের কারণে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে।
চিকিৎসকরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। তার প্রভাব এখন বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। এ কারণে সরকার নতুন করে গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে।
কুমিল্লার হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে চিকিৎসাসেবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। হাসপাতালের শয্যাসংকট, জনবল ঘাটতি এবং সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলোও তাঁর নজরে আনা হয়। অনেক রোগী ও স্বজন হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, ওষুধ সংকট ও দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ করেন।
মন্ত্রী এসব অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ঈদুল আজহার ছুটির সময়েও হাসপাতালের জরুরি সেবা কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে তিনি কঠোর নির্দেশনা দেন।
স্বাস্থ্য খাত বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের টিকাদান কার্যক্রমে সাফল্য ইতিবাচক দিক হলেও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে জনবল সংকট, পর্যাপ্ত বেডের অভাব এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। ফলে শুধু টিকাদান নয়, সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজের সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় গুজব, ভুল তথ্য কিংবা টিকা নিয়ে ভয় থেকে অভিভাবকেরা শিশুদের টিকা দিতে অনীহা দেখান। এর ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হামের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কার্যকর বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় সরকার হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ছুটিকালীন দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের দাবি অনুযায়ী হামের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় সাফল্য এলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান কার্যক্রম কতটা কার্যকর হয় এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কত দ্রুত উন্নতি আনা যায়, সেটিই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।