প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদকে সামনে রেখে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথগুলোতে ঘরমুখো মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ভোলার ইলিশা ঘাটে প্রতিদিনই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যাত্রীদের ঢল নামছে। তবে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, নাব্য সংকট এবং পরিবহন সংকটের কারণে অনেক যাত্রীকে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল মেঘনা নদী ছোট ট্রলারে পার হতে দেখা গেছে।
সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকেই ঢাকা ও লক্ষ্মীপুর রুটে একের পর এক লঞ্চ ও ট্রলার ইলিশা ঘাটে ভিড়তে থাকে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা আটটি লঞ্চে ছিল অতিরিক্ত যাত্রী, যা স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর ঘাট থেকে ছোট ট্রলারে করে হাজারো যাত্রী ভোলা অভিমুখে রওনা দেন।
নৌপরিবহন ব্যবস্থার এমন চাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন লক্ষ্মীপুর রুটের যাত্রীরা। অনেকেই লঞ্চ না পেয়ে বাধ্য হয়ে ছোট ট্রলারে ওঠেন, যেখানে ছিল না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ছাউনি বা জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম। নদীর উত্তাল ঢেউ ও তীব্র গরমে এসব যাত্রা হয়ে ওঠে চরম দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানান, তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লঞ্চ না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রলারে উঠতে বাধ্য হয়েছেন। একজন যাত্রী জানান, নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ টাকা দিতে হয়েছে, তবুও নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা ছিল না। খোলা ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণে নড়াচড়া করারও সুযোগ ছিল না।
আরেক যাত্রী জানান, মাঝনদীতে পৌঁছানোর পর ঢেউয়ের কারণে ট্রলার দুলতে থাকে, যা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেছিলেন, যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবুও ঈদে পরিবারের কাছে পৌঁছানোর তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই তারা যাত্রা অব্যাহত রাখেন।
ঢাকা থেকে আসা যাত্রীরা তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও লক্ষ্মীপুর রুটের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিছু যাত্রী অভিযোগ করেন, লঞ্চগুলো মাঝনদীতে নাব্য সংকটের কারণে আটকে যায়, ফলে বিকল্প হিসেবে ট্রলারে স্থানান্তর করা হয়।
এদিকে নৌরুটে ট্রলার চলাচল নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ ট্রলারে যাত্রী পরিবহন চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে ট্রলারচালকদের দাবি ভিন্ন। তারা জানান, লঞ্চ আটকে যাওয়ায় যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। যাত্রীদের চাপ ও পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে তাদের ট্রলারে পারাপার করাতে হয়েছে। একজন ট্রলারচালক বলেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ মানবিক কারণে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র সহকারী পরিচালক জানান, নদীতে নাব্য সংকটের কারণে কিছু লঞ্চ মাঝপথে ডুবোচরে আটকে গেছে। ফলে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ট্রলারে যাত্রী পারাপার হচ্ছে।
ঈদকে কেন্দ্র করে নৌপথে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। প্রতি বছরই ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়লে দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটগুলোতে অব্যবস্থাপনা, নাব্য সংকট এবং অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
নৌপরিবহন বিশ্লেষকরা বলছেন, নদীপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে লঞ্চ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং অবৈধ ট্রলার চলাচল বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে ঈদের মতো সময়গুলোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
স্থানীয়রা মনে করছেন, ঈদযাত্রা যেন মানুষের আনন্দের বদলে আতঙ্কে পরিণত না হয়, সে জন্য এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নৌপথে পর্যাপ্ত লঞ্চ, নিরাপদ ঘাট ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি উদ্ধার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে ভোলার ইলিশা ঘাট ও মেঘনা নদীর নৌপথে ঈদযাত্রা এখন একদিকে যেমন মানুষের বাড়ি ফেরার আনন্দের প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।