প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দশ বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে পরিবারের অভাব দূর করে দেশে ফিরেছিলেন আরিফ ইসলাম। মনে ছিল রঙিন স্বপ্ন, বাড়িতে ফিরে বিয়ে করার পরিকল্পনা। প্রিয়জনদের হাসিমুখ দেখার আকাঙ্ক্ষায় তিন মাসের ছুটিতে মালয়েশিয়া থেকে ফিরছিলেন তিনি। তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিল পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, প্রিয়জনকে বরণ করে ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেল আরিফসহ তার পরিবারের চার সদস্য এবং চালকের প্রাণ। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং স্তব্ধ করে দিয়েছে গোটা এলাকাকে। আনন্দের দিনটি যে এমন শোকের কালো মেঘে ঢেকে যাবে, তা ছিল কল্পনাতীত।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার দিবাগত রাত পৌনে চারটার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম ফ্লাইওভার এলাকায়। গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই একটি বিকল ট্রাক মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কুয়াশাচ্ছন্ন রাত আর ট্রাকটির কোনো সংকেত না থাকায় আরিফদের বহনকারী দ্রুতগামী প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকের পেছনে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয়। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতরেই মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায় প্রাণগুলো। ঘটনাস্থলেই নিহত হন আরিফের মা নূর জাহান বেগম, বোন আয়শা খাতুন, প্রবাসী আরিফ নিজে এবং গাড়িচালক জাহিদ হোসেন। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরিফের ছোট ভাই রাকিবুল ইসলাম। পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা পুরুষ সদস্য শহিদুল ইসলাম এখন শোকে পাথর হয়ে গেছেন।
নিহত আয়শা খাতুনের স্বামী ইলিয়াস সরদার এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, আরিফ মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন কেবল পরিবারের ঋণ পরিশোধ ও ভালো একটি বাড়ি তৈরির জন্য। সব দায়িত্ব পালন শেষে এবার নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর পরিকল্পনা করেছিলেন। তার আসার অপেক্ষায় পুরো পরিবার আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছিল। বিয়ের সব প্রস্তুতিও প্রায় চূড়ান্ত ছিল। শাশুড়ি, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে আরিফকে আনতে বিমানবন্দরে যাওয়ার সময় তিনি বুঝতেও পারেননি যে, এটিই তাদের শেষ যাত্রা। প্রাইভেটকারে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ইলিয়াস সরদার সাথে যেতে পারেননি, যা তাকে আজীবন এক গভীর অপরাধবোধ ও গ্লানির মধ্যে রাখবে।
দুর্ঘটনার সময় প্রাইভেটকারটিতে দুটি শিশুও ছিল—আয়শার সাত বছর বয়সী ছেলে আশরাফুল হুসাইন ও তিন বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া খাতুন। আল্লাহর অশেষ রহমতে দুই শিশু এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও তারা হারিয়েছে তাদের মা ও নানুসহ স্বজনদের। তাদের আর্তনাদ আর কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। এই দুটি অবুঝ শিশু এখন বুঝে উঠতে পারছে না কেন তারা আর কখনো তাদের মায়ের কোল খুঁজে পাবে না। পরিবারের সদস্যরা এখন কেবল ওই দুই শিশুর মুখ চেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত যে দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজনদের হারিয়েছেন, সেই কষ্ট ভোলার নয়।
শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে নিহত চারজনের লাশ পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে আহাজারি আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে। একটি পরিবারের মা, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে হারিয়ে বাবা শহিদুল ইসলামের জীবন এখন শূন্যতায় ঘেরা। তিনি ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাতেন। সন্তানদের সুখী করার জন্য তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, কিন্তু আজ তাকে একা পৃথিবীতে রেখে তার রক্ত-মাংসের স্বজনরা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা মেনে নেওয়া তার মতো একজন বৃদ্ধ মানুষের জন্য অসম্ভব।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আরও একবার বড় ধরনের প্রশ্ন উঠল এই দুর্ঘটনার পর। মহাসড়কের মতো দ্রুতগতির রাস্তায় কোনো সংকেতবিহীন বিকল ট্রাক কেন পড়ে থাকবে? এমন ছোট ছোট অবহেলা বা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করার কারণে প্রায়ই ঝরে যাচ্ছে অমূল্য সব প্রাণ। কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আর চালকদের অসতর্কতা মিলিয়ে যে অশুভ জোট তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিন দিন কেড়ে নিচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকটি যদি যথাযথ সংকেত দিত অথবা ট্রাফিক আইন অনুযায়ী দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হতো, তবে হয়তো আরিফদের হাসি মুখগুলো আজ বেঁচে থাকত। এই শোকের ভার দেশবাসী বহন করছে, কিন্তু যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের শোকের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই।
পরিশেষে, আরিফ ইসলামের মালয়েশিয়া থেকে ফেরার স্বপ্ন ছিল সততার ও ত্যাগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। সে নিজের জীবনের চেয়ে পরিবারের সুখকে বড় করে দেখেছিল। কিন্তু নিয়তি তাকে সেই সুখের স্বাদ নিতে দিল না। তার পরিবার আজ নিঃস্ব, তাদের চোখের জল আর নীরব হাহাকার সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। সরকারিভাবে এই দুর্ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। শুধু আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করলেই একটি পরিবারের বিশাল শূন্যতা পূরণ হয় না। সরকার ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে হয়তো বেঁচে থাকা দুই শিশুর ভবিষ্যৎ কিছুটা সুরক্ষিত হতে পারে। আরিফদের এই অকাল প্রস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জীবন কতটা ক্ষণস্থায়ী, আর নিরাপত্তা কতটা অপরিহার্য। আল্লাহ তাদের আত্মার শান্তি দান করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অসহ্য শোক সহ্য করার শক্তি দিন।