প্রকাশ: ২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাহাড়ের শান্ত জনপদ রাঙ্গামাটি শহরে এক শোকাবহ ঘটনার ছায়া নেমে এসেছে। সোমবার দিবাগত রাতে তবলছড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সাজেদুল হক নামক এক পুলিশ কর্মকর্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি রাঙ্গামাটি সদর পুলিশ ফাঁড়িতে উপ-পরিদর্শক বা এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মময় জীবনের ব্যস্ততা আর পারিবারিক দায়িত্বের মাঝে থাকা এই পুলিশ সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে তার সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয়দের মাঝে গভীর শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। একটি সাজানো সংসার, যেখানে স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে স্বপ্ন ছিল তার, সেই স্বপ্নের নীড় থেকেই তার নিথর দেহ উদ্ধারের দৃশ্যটি সবাইকে ব্যথিত করেছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, সোমবার দিনগত রাত পৌনে একটার দিকে রাঙ্গামাটির কোতোয়ালি থানার পুলিশ সদস্যরা তবলছড়ি পোস্ট অফিস কলোনির ওই বাসায় উপস্থিত হন। পুলিশ আসার আগে স্ত্রী সাজেদা বেগম তার স্বামীর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেই রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো এক বিষয়ে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়েছিল। সেই ক্ষোভের রেশ ধরেই সাজেদুল হক নিজের রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও দরজা না খোলায় স্ত্রী বিভিন্নভাবে তাকে ডাকার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই নিঃশব্দ নীরবতা পরিবারের সদস্যদের মনে ভয়ের সঞ্চার করে এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় দরজা ভাঙলে সাজেদুল হকের ঝুলন্ত দেহ নজরে আসে।
এই মর্মান্তিক সংবাদটি পাওয়ার পরপরই রাঙ্গামাটির পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন ও মো. জসীম উদ্দীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল মরদেহটি উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এই ঘটনার পর রাঙ্গামাটির পুলিশ মহলে শোকের আবহ বইছে। একজন সহকর্মী হিসেবে সাজেদুল হক সবার কাছে বেশ পরিচিত ছিলেন। তার অকাল প্রস্থানকে সবাই মেনে নিতে পারছেন না। ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ পারিবারিক কলহকে এই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে সন্দেহ করছে। পুলিশের দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তা, যিনি প্রতিদিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকেন, তিনি নিজেই এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এটি তার নিকটজনদের জন্য হৃদয়বিদারক। পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আত্মহত্যার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণটি খুঁজে বের করতে তারা কাজ করছেন। জামালপুর সদর উপজেলার হনুমানেরচর গ্রামের বাসিন্দা এই পুলিশ সদস্য রাঙ্গামাটিতে বেশ কয়েক বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে তার সংসার জীবন স্বাভাবিকই ছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। তবে পর্দার আড়ালে কোনো মানসিক যন্ত্রণা বা কোনো চাপা কষ্ট তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল কি না, তা নিয়ে এখন নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
পুলিশের মতো একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করা ব্যক্তিদের মানসিক চাপ অনেক সময় প্রকট হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে পাহাড়ি জনপদে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিবেশগত ও পারিবারিক দূরত্বের কারণে এক ধরনের একাকীত্ব তৈরি হতে পারে। সাজেদুল হকের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তদন্তও গুরুত্ব পাবে। একজন এসআই হিসেবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের মাঝে কোনো সামঞ্জস্যহীনতা তৈরি হয়েছিল কি না, তা এই তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আসা নির্দেশনার ভিত্তিতে এই মৃত্যুর ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
সাজেদুল হকের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ধ্বংস নয়, বরং এক মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তাকে হারানোর শোক। তার ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। একজন বাবা হিসেবে তিনি হয়তো তার স্বপ্নগুলো পূরণ করার জন্য অনেক পথ পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু একটি মুহূর্তের আবেগ বা ভুল সিদ্ধান্তের কাছে সব স্বপ্ন ধূসর হয়ে গেল। এই ঘটনাটি আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের সংকটময় মুহূর্তে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কতটা জরুরি। যেকোনো ধরনের পারিবারিক কলহ বা ব্যক্তিগত মানসিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যে জীবন রক্ষা করতে পারে, তা এই করুণ পরিণতি থেকে উপলব্ধি করা যায়।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাজেদুল হকের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিজ ভূমিতেই হয়তো শেষ বিশ্রাম নেবেন তিনি। রাঙ্গামাটির পুলিশ প্রশাসন তার পরিবারকে সব ধরণের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এই শোকের সময়ে তার সহকর্মীরা সহমর্মিতা প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি একজন দক্ষ ও সাহসী পুলিশ সদস্য ছিলেন। তার মৃত্যুতে রাঙ্গামাটি পুলিশ ফাঁড়িতে এক বড় শূন্যতা তৈরি হলো। শোকের এই ছায়া কাটাতে সময় লাগবে। তার স্বজনদের আর্তনাদ আর সহকর্মীদের চোখের জল এখন রাঙ্গামাটির তবলছড়ি কলোনির পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে। একটি সাজানো জীবনের অকাল সমাপ্তি আমাদের জন্য কেবলই একটি বিষাদময় সংবাদ নয়, বরং এটি জীবনের চরম অনিশ্চয়তার এক কঠিন পাঠ।