প্রকাশ: ২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর দেশের সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির নতুন দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি কর্তৃক ঘোষিত জুন মাসের নতুন দর অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগের মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও, তার আগের মাসগুলোতে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যে চাপের মুখে পড়েছিল, এই সামান্য মূল্যহ্রাস তাদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এই নতুন দর কার্যকর হয়েছে, যা সারা দেশের খুচরা পর্যায়ে এখন থেকে অনুসরণ করা হবে।
বিইআরসির সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সিপি অনুযায়ী এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এলপিজির দাম বিশ্ববাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় প্রতি মাসে বিইআরসিকে এই সমন্বয়ের কাজটি করতে হয়। গত এপ্রিল মাসে দুই দফায় এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ১৯ এপ্রিল মাত্র অল্প সময়ের ব্যবধানে ২১২ টাকা বৃদ্ধির বিষয়টি সাধারণ গ্রাহকদের দৈনন্দিন বাজেটে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে ৫৫ টাকা দাম কমলেও, দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের অভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো এক ধরনের শঙ্কা রয়ে গেছে।
১২ কেজি সিলিন্ডারের পাশাপাশি অটোগ্যাসের দামেও কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে। জুন মাসের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৯ পয়সা কমিয়ে ৮৬ টাকা ৯৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মে মাসে যেখানে দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৯ টাকা ৫২ পয়সা হয়েছিল, সেখানে বর্তমান এই হ্রাস পরিবহন খাতের চালক ও মালিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে। অটোগ্যাসের দামের ওপর নির্ভর করে যেহেতু গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানবাহনের খরচের একটি বড় অংশ নির্ধারিত হয়, তাই এই দামের হ্রাস পরিবহন সংশ্লিষ্টদের জন্য কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে।
এলপি গ্যাসের দামের এই অস্থিরতা নিয়ে গত কয়েক মাসে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উভয়ই চরম চাপের মুখে ছিলেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করেন, তারা দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের পণ্যের মূল্য বাড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। আবার গৃহস্থালি পর্যায়ে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির কোনো বিকল্প না থাকায় দাম বাড়লেও মানুষ এটি কেনা বন্ধ করতে পারে না। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা থেকে টাকা কমিয়ে গ্যাসের বিল মেটানো অনেকের জন্য নিয়মিত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের এই মূল্যহ্রাসের সিদ্ধান্তটি যদিও খুব বিশাল কোনো পরিবর্তন আনবে না, তবে এটি অন্তত একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে কাজ করছে যে, কমিশন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করছে।
মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিইআরসির এই স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত জরুরি। গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কমিশনের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় না করে, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অনেক সময় খুচরা বাজারে ডিলার ও বিক্রেতারা কমিশনের নির্দেশনার চেয়ে বাড়তি দাম নিয়ে থাকেন, যা ভোক্তা অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বর্তমান এই জটিল সময়ে যখন বিশ্ব অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির কবলে, তখন জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখাটা প্রতিটি দেশের জন্যই একটি বড় পরীক্ষা। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এই ধরনের সমন্বয় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এলপিজির দামের এই হ্রাস সাধারণ মানুষের জন্য এক টুকরো স্বস্তি হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি পণ্যের দাম যেকোনো সময় বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য সরকার যদি এলপিজির বিকল্প হিসেবে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতা বা নিজস্ব উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবেই সাধারণ গ্রাহকরা এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ততোদিন পর্যন্ত বিইআরসির এই ধরণের নিয়মিত ও যৌক্তিক মূল্য সমন্বয়ই সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিতে পারে। আজকের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে অন্তত এই জুন মাসে গ্যাসের খরচ নিয়ে পরিবারগুলোকে কিছুটা কম ভাবলেও চলবে।