প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের আকাশ-বাতাস এখন ভারী হয়ে আছে চার বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু ফাহিমার করুণ মৃত্যুতে। অপহরণ, ধর্ষণচেষ্টা এবং এরপর নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হওয়া এই শিশুটির অকাল প্রস্থান পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে সিলেটের সোনাতলায় ফাহিমার শোকার্ত বাবা-মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাদের বাড়িতে ছুটে যান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফাহিমার স্বজনদের কান্নার আর্তনাদে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শোকার্ত বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না কেউই। ডা. শফিকুর রহমান ফাহিমার পরিবারের সদস্যদের কথা শোনেন এবং তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সাক্ষাৎ শেষে ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যে, আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শিশু ফাহিমার হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ফাহিমার মতো এমন নিষ্পাপ প্রাণ বারবার ঝরে পড়ছে। তিনি বলেন, একটি সভ্য সমাজে চার বছরের শিশুর ওপর এই ধরনের বর্বরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যদি অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় না আসে, তবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তিনি সরকারকে অনতিবিলম্বে এই মামলার দায়িত্ব নিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা রাখতে পারে।
ফাহিমার মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এটি জাতীয় বিবেকের জন্য একটি বড় ক্ষত। বিরোধীদলীয় নেতা মনে করেন, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যদি এখন ঐক্যবদ্ধ না হয় এবং এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ না তোলে, তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ফাহিমার ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান। তিনি আরও যোগ করেন যে, বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং কোনো শিশু যেন রাষ্ট্রের অবহেলায় এমন মৃত্যুর শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
সাক্ষাৎকালে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ স্থানীয় নেতারা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিলেট অঞ্চলের পরিচালক অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরীর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবং সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমানসহ স্থানীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উল্লেখযোগ্য। নেতৃবৃন্দ একাত্মতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, তারা ফাহিমার পরিবারের পাশে রয়েছেন এবং অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটিয়ে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে তাদের কড়া নজর থাকবে। তারা ফাহিমার পরিবারের নিরাপত্তা এবং তাদের ওপর নেমে আসা এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ফাহিমার শোকার্ত বাবা-মায়ের আর্তনাদ ও বুকফাটা কান্না উপস্থিত সবার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। একটি ফুটফুটে শিশু, যার স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার, পৃথিবীকে জানার, তাকে এমন নির্মমভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে—এটি মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টকর। ফাহিমার মা বারবার ডুকরে কেঁদে উঠছিলেন আর বলছিলেন, তার শিশুর কোনো অপরাধ ছিল না। ডা. শফিকুর রহমান তার সমবেদনা বার্তায় উল্লেখ করেন, কোনো কিছুর বিনিময়ই ফাহিমার এই হারানো জীবন ফিরিয়ে আনতে পারবে না, তবে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হলে অন্তত তার বাবা-মায়ের হৃদয়ে কিছুটা হলেও প্রশান্তি আসবে। তারা এই বিচার পাওয়ার আশায় এখন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়ছেন।
পরিশেষে ডা. শফিকুর রহমান সমাজের প্রতিটি মানুষকে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় যদি নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করে, তবে শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। সরকার যদি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না করে তবে তা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেবে। তিনি আশাবাদী যে, জনমতের চাপে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে এবং ফাহিমার পরিবার খুব শিগগিরই সুবিচার পাবে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা কোনো আপস না করে অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফাহিমার মৃত্যু যেন বৃথা না যায় এবং এটিই হোক শেষ করুণ ঘটনা—এই প্রত্যাশাই এখন দেশবাসীর।