প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের উত্তপ্ত পরিস্থিতি আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে। গত ২৪ মে রেললাইনে চালানো ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জেরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস বা আইএসপিআর-এর পক্ষ থেকে মঙ্গলবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের ফলশ্রুতিতে অন্তত ১৭ জন সন্ত্রাসী বা ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছেন। দেশটির নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন বড় ধরনের সাফল্য বেলুচিস্তানের অস্থিরতা নিরসনে নতুন মাত্রা যোগ করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত মে মাসের শেষভাগে বেলুচিস্তানের মাটিতে যে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছিল, তার উপযুক্ত জবাব দিতেই নিরাপত্তা বাহিনী এই বিশেষ অপারেশন বা অভিযানগুলো সাজায়। মাস্টাং, নুশকি, জেহরি, খুজদার এবং কেচ জেলাকে কেন্দ্র করে এই গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, নিহতরা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সাধারণ অস্ত্রধারী নন, বরং তারা বিদেশি মদদপুষ্ট এমন একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য যারা দীর্ঘদিন ধরে বেলুচিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। আইএসপিআর-এর দাবি অনুযায়ী, এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের বড় বড় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে এই গোষ্ঠীটির সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।
অভিযানের তীব্রতা ছিল লক্ষ্য করার মতো। আইএসপিআর জানিয়েছে, যখন নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের আস্তানাগুলো ঘিরে ফেলে, তখন উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। জঙ্গিরা আধুনিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স ও ফ্রন্টিয়ার কর্পস-এর দৃঢ় অবস্থানের সামনে তারা টিকতে পারেনি। গোলাগুলির একপর্যায়ে ১৭ জন জঙ্গি নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং প্রচুর বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ প্রস্তুতকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি, যা দিয়ে তারা আরও বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মে কোয়েটা শহরের চমন ফটকের কাছে রেললাইনের পাশে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেই হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং বহু সাধারণ মানুষ আহত হয়েছিলেন। হতাহতদের মধ্যে নারী ও শিশু যেমন ছিল, তেমনি সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও। ওই বিস্ফোরণে ফ্রন্টিয়ার কর্পসের তিনজন সদস্য নিহত হন, যা গোটা পাকিস্তানে শোকের ছায়া ফেলেছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছিল। সেই ঘটনার পরপরই দেশটির বেলুচিস্তান সরকার দোষীদের কঠোর বিচারের আওতায় আনার প্রতিজ্ঞা করেছিল এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় করা হয়েছিল। আজকের এই ১৭ জনের মৃত্যুর খবর সেই প্রতিশোধমূলক অভিযানেরই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।
নিহতদের পরিচয় এবং তাদের বিদেশি মদদদাতা বা নেপথ্যের কুশীলবদের বিষয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রায়ই অভিযোগ করা হয় যে, বেলুচিস্তানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে। আজকের অভিযানের পর সেই অভিযোগের সুর আরও জোরালো হয়েছে। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বেলুচিস্তানের মতো একটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জটিল অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি নিশ্চিত করতে কেবল সামরিক শক্তিই যথেষ্ট নয়। বরং সেখানে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বেলুচিস্তান প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে উন্নয়নের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বারবার নাশকতার কারণে সেখানকার সাধারণ জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। সাধারণ মানুষ তাদের স্বাভাবিক চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। গত ২৪ মে-র বিস্ফোরণটি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর একটি বড় আঘাত। ট্রেন যাত্রীদের নিরাপদ চলাচলের পথে এমন বোমা হামলা জনমনে যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি। এমতাবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিচালিত এই সফল অভিযান সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কেবল অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী নির্মূল করা যাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই যায়। অনেক সমাজবিজ্ঞানীর মতে, এই ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত কেবল একটি চক্র তৈরি করে। প্রতিবার অভিযানের পর পাল্টা আক্রমণের ভয় থেকে যায়। তাই বর্তমান এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারকে সামরিক কৌশলের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক আলোচনার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় কোনো ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশ ইরানের সঙ্গেও তাদের কৌশলগত সম্পর্কের সমীকরণ এই নিরাপত্তা ইস্যুগুলোকে প্রভাবিত করছে।
সব মিলিয়ে বেলুচিস্তানের উত্তপ্ত পরিস্থিতি এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ১৭ জন জঙ্গির মৃত্যু নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হলেও, সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জটি রয়েই গেল। একটি বাংলাদেশ অনলাইন সব সময় আশা করে যে, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের দাপট কমে আসুক এবং বেলুচিস্তানের মানুষের জীবনে ফিরে আসুক কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি। পাকিস্তান সরকারের এই কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং তাদের অভাব-অভিযোগের সুরাহা করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই অশান্ত প্রদেশটি পুনরায় শান্তির নীড়ে পরিণত হবে। আজকের এই অভিযান তারই একটি বড় বার্তা বহন করছে যে, দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সাহস দেখালে রাষ্ট্রযন্ত্র তার কঠোর জবাব দিতে পিছপা হবে না।