প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন দিগন্তে যুক্ত হলো আরও একটি অভিজ্ঞ নাম। দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে সাবেক লেগ-স্পিনার সাইরাজ বাহুতুলেকে চূড়ান্ত করেছে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বা বিসিসিআই। মঙ্গলবার বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ৫৩ বছর বয়সী এই প্রথিতযশা কোচ কেবল একজন খেলোয়াড় হিসেবেই নন, বরং কোচিং জগতে তার সূক্ষ্ম কৌশল এবং তরুণ প্রতিভাকে গড়ে তোলার দক্ষতার জন্য সুপরিচিত। ভারতীয় ক্রিকেটের স্পিন ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত বাহুতুলের এই দায়িত্ব গ্রহণকে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
সাইরাজ বাহুতুলের ক্রিকেটীয় ক্যারিয়ার দুই দশকেরও বেশি বিস্তৃত। খেলোয়াড় জীবনে তিনি ছিলেন একজন লড়াকু লেগ-স্পিনার। ভারতের হয়ে দুটি টেস্ট এবং আটটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটে তার পরিসংখ্যান রীতিমতো ঈর্ষণীয়। প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে ৬৩০টি উইকেট শিকার এবং ছয় হাজার ১৭৬ রান করার কৃতিত্ব প্রমাণ করে যে, তিনি ব্যাট এবং বল উভয় ক্ষেত্রেই ছিলেন সমান পারদর্শী। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বড় বিষয় হলো মাঠের পরিস্থিতি বোঝার অসামান্য ক্ষমতা, যা তাকে একজন সফল কোচ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি নিজেই নিজেকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন কোচিংয়ের আঙিনায়।
কোচ হিসেবে বাহুতুলের ঝুলি সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় ঠাসা। তিনি বিদর্ভ, কেরালা, গুজরাট এবং বাংলা ক্রিকেট দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে ঘরোয়া ক্রিকেটে তরুণ স্পিনারদের টেকনিক্যাল ভুলত্রুটি শুধরে তাদের আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি সবসময়ই ছিলেন তৎপর। আইপিএলের মতো হাইপ্রোফাইল টুর্নামেন্টে রাজস্থান রয়্যালস ও পাঞ্জাব কিংসের স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান দিয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিআই-এর সেন্টার অব এক্সিলেন্সের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি জাতীয় দলের পাইপলাইনে থাকা তরুণদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত।
তার কোচিং ক্যারিয়ারের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হলো ২০২২ সালে ভারতের আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়। ওই টুর্নামেন্টে ভারতের বোলিং কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। এছাড়া ২০২৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ আসরেও দলের সাপোর্ট স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সাথে একটি গভীর বন্ধন গড়ে তুলেছেন। আজকের এই নিয়োগের পর সাইরাজ বাহুতুলে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ভারতের জাতীয় দলের স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাওয়া একজন খেলোয়াড় ও কোচের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয়। খেলোয়াড় হিসেবে দেশীয় জার্সিতে প্রতিনিধিত্ব করার পর কোচ হিসেবে জাতীয় দলের সাফল্যে অবদান রাখার সুযোগ পাওয়া তার কাছে এক বিশেষ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।
বাহুতুলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল দলের অভিজ্ঞ স্পিনারদের সাথে কাজ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্পিন শক্তির জোগান দেওয়া। বিশেষ করে আগামী ৬ জুন মুল্লানপুরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অনুষ্ঠিতব্য একমাত্র টেস্ট ম্যাচটি হবে তার অগ্নিপরীক্ষা। সেই ম্যাচে দলের তরুণ উদীয়মান স্পিনার মানব সুথার ও হর্ষ দুবের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দিকনির্দেশনা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব তার কাঁধে। আফগানিস্তানের মতো প্রতিপক্ষের স্পিন আক্রমণ বরাবরই শক্তিশালী হয়, আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাহুতুলের রণকৌশল কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, বাহুতুলের এই নিয়োগ বিসিসিআই-এর একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। ভারতীয় দল সব ধরনের ফরম্যাটেই এখন বিশ্বমানের ক্রিকেট খেলছে, আর সেই ধারায় স্পিন বিভাগকে আরও শক্তিশালী করতে এমন একজন অভিজ্ঞ মানুষের প্রয়োজন ছিল যিনি একই সাথে মাঠের বাস্তবতাকে চেনেন এবং নতুনদের সাহস জোগাতে পারেন। বাহুতুলে কেবল বলের ঘূর্ণি বাড়ানোর কাজ করবেন না, বরং চাপের মুখে একজন বোলার কীভাবে মানসিকভাবে স্থির থাকে, তাও শেখাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সাইরাজ বাহুতুলের ক্রিকেট দর্শন হলো শৃঙ্খলা এবং সৃজনশীলতা। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন বোলার তখনই সেরা হতে পারে যখন তার বোলিং অ্যাকশন ও মানসিকতায় নিখুঁত ভারসাম্য থাকে। তার হাত ধরে ভারতের স্পিন বোলিং বিভাগ নতুন কোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার অতীত সাফল্যের রেকর্ড এবং খেলোয়াড়দের সাথে তার সুসম্পর্কের কথা মাথায় রাখলে এটা বলাই যায় যে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের স্পিন বিভাগ এখন নিরাপদ হাতেই রয়েছে। গোটা দেশের ক্রিকেট মহলের প্রত্যাশা এখন একটাই, বাহুতুলের তত্ত্বাবধানে ভারতীয় স্পিনাররা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের পিচে তাদের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে যাবে।