প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় বর্তমানে এক চরম উত্তেজনা ও মানবিক সংকট বিরাজ করছে। প্রতিবেশী দেশ কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেনিয়ায় একটি বিশেষ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই উদ্যোগ কেনিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ভীতি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সোমবার দেশটির নানিয়ুকি শহরে এই মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিবাদে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে দুই তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন, যা পুরো দেশে শোকের ছায়া ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিহতদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। গুলিতে প্রাণ হারানো এক তরুণের পরিবার দাবি করেছে, তাদের সন্তান কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বিক্ষোভের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল না। সে কেবল রাস্তা দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়ার পথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলির শিকার হয়। এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেনিয়ার জনমনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। একজন সাধারণ তরুণের অকাল মৃত্যুতে পরিবারগুলোর আহাজারি এবং জনগণের ক্ষোভ এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও পুলিশ কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় প্রশাসন এখনো পর্যন্ত এই মৃত্যুর দায়ভার বা গুলির ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মূলত মার্কিন নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য কেনিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটির ভেতরে ৫০ শয্যার একটি ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। আমেরিকার যুক্তি হলো, কঙ্গোতে আক্রান্ত মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে এই কেন্দ্রটি জরুরি। তবে কেনিয়ার সাধারণ নাগরিক এবং দেশটির চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার কঠোর বিরোধিতা করে আসছে। কেনিয়ায় এখন পর্যন্ত ইবোলা আক্রান্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এই কেন্দ্র স্থাপনের ফলে যদি ভুলবশত বা অসতর্কতায় ভাইরাসটি কেনিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, তবে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে কেনীয় নাগরিকরা এই ঝুঁকি নিতে কোনোভাবেই রাজি নন।
এই বিক্ষোভ ও উত্তেজনার প্রেক্ষিতে কেনিয়ার হাইকোর্ট কেন্দ্রটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সামরিক ঘাঁটিতে কেন্দ্র তৈরির প্রস্তুতি থেমে নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটো সরাসরি এই মার্কিন পরিকল্পনার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের খাতিরে এবং মানবিক কারণ বিবেচনা করে তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, জনস্বাস্থ্যের চেয়েও বড় বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রগত সিদ্ধান্ত। তিনি রাজনৈতিক স্বার্থে এই ইস্যুকে ব্যবহার না করার জন্য জনগণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। সরকার সব দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন।
তবে রাষ্ট্রপতির এই আশ্বাসে সাধারণ মানুষের ভয়ের কোনো নিরসন হয়নি। দেশের উচ্চ আদালত পুনরায় সরকারকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, এই চিকিৎসা কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কিত সব তথ্য জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। কেনিয়ার জনগণ মনে করছেন, তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চিকিৎসার নামে বাইরের ভাইরাস দেশে নিয়ে আসার চেয়ে নিজেদের বর্তমান স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কেন্দ্রটিকে কেনিয়ার সাধারণ মানুষ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
আফ্রিকান দেশগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ এবং তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কেনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই ইতিহাসের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একদিকে রাষ্ট্রপতির আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে নাগরিকদের জীবন রক্ষা করার দাবি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে কেনিয়া এখন একটি সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নানিয়ুকি শহরের এই ঘটনা কেবল দুটি প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সারা কেনিয়ায় ইবোলা বিরোধী কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে একটি গণআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও কেনিয়ার এই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কোনো রাষ্ট্র যদি তার জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে বিদেশি কোনো শক্তির স্বার্থে এমন কোনো কাজ করে যা জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তবে তা কি গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? এই প্রশ্ন এখন কেনিয়ার বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের কণ্ঠে বারবার উঠে আসছে। কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটোকে এখন একদিকে যেমন ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে বন্ধুত্বের মর্যাদা রাখতে হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে নিজের দেশের জনগণের আস্থার সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইবোলা একটি মরণঘাতী ভাইরাস। এর প্রাদুর্ভাব নিয়ে ভয় পাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেনিয়া সরকার যদি জনগণের ভয় দূর করতে ব্যর্থ হয় এবং স্বচ্ছতার সাথে তথ্যের আদান-প্রদান করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা থেকে যায়। নিরপরাধ দুই তরুণের রক্ত যেন বৃথা না যায় এবং কেনিয়ার মাটি এই ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকে—এমনটাই এখন সারা বিশ্বের প্রত্যাশা। সংকট সমাধানে কেবল সামরিক শক্তি বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নয়, বরং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে আসা এবং তাদের নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়াই এখন কেনিয়া প্রশাসনের একমাত্র পথ।