নবজাতক মৃত্যু: অপরাধীদের কোনো ছাড় নয়, হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৩০ বার
নবজাতক মৃত্যু: অপরাধীদের কোনো ছাড় নয়, হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

প্রকাশ: ৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল গত ২৭ মে ঈদুল আজহার ঠিক আগের দিন আদ-দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু। প্রসূতি মায়েদের আনন্দময় মুহূর্তগুলো নিমেষেই শোকের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে গেল হাসপাতালের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে। আজ বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই হৃদয়বিদারক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, এই জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর মনে বিচার পাওয়ার সামান্যতম আশা জাগিয়ে তুলেছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেন যে, প্রায়ই দেখা যায় ময়নাতদন্ত ছাড়া মামলা হলে আসামিপক্ষ আইনি মারপ্যাঁচে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পায়। তবে আদ-দ্বীন হাসপাতালের এই ছয় নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় অপরাধীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। তিনি এটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে আখ্যায়িত করে জানিয়েছেন যে, আদালতের বিচারকরাও এ ধরনের ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন। সুতরাং কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তে নয়, বরং বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ছয় নবজাতকের অকাল মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার সরাসরি ফল। এই অপরাধের দায়ভার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না এবং তাদের আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতেই হবে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে সরকার দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং আজই সেই প্রতিবেদনের ফলাফল পাওয়ার কথা রয়েছে।

নবজাতক মৃত্যুর এই শোকাবহ ঘটনার মধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তনের জন্য একগুচ্ছ যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, দেশের ৪৯২টি উপজেলাতেই এখন থেকে বিদ্যমান ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে। এর ফলে উপজেলা পর্যায়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আগামী ছয় মাসের মধ্যে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা বিভাগে পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনাও গৃহীত হয়েছে। এই প্রতিটি শিশু হাসপাতালে অত্যাধুনিক আইসিইউ সুবিধা থাকবে, যা অকাল মৃত্যু রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি বিশেষ যৌথ উদ্যোগের কথাও জানান। চীনের সহায়তায় বাংলাদেশে নারীদের জন্য এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বৃহৎ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এগারোশ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মেডিকেল ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির বলয় ভাঙার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, সরকার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনার কাজ করছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি ও তদারকি ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন যে, দেশের ছয় থেকে দশটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার এক নতুন উদ্যোগ শুরু করা হবে। যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে পরবর্তীতে তা পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, রোগ প্রতিরোধের দিকে সরকার বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ ও ভেরিয়েন্ট পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। হাম ও ডেঙ্গু রোগের মতো সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের জন্য দেশজুড়ে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার সুবিধার্থে প্রতিটি প্রাইভেট হাসপাতালে দশ শতাংশ বেড বরাদ্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ফি বা প্রতিবেদনের ওপর আশি শতাংশ পর্যন্ত ছাড় প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা করতে পারে।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় এবং সেবার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। মন্ত্রী মনে করেন, স্বাস্থ্য খাত কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি সেবার মানসিকতা ও দায়বদ্ধতার ওপরও নির্ভর করে। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনায় সরকারের এই কঠোর অবস্থান জনমনে এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে যে, স্বাস্থ্য খাতের যেকোনো অবহেলা বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি অবলম্বন করবে। মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো ব্যবসা বা মুনাফা হতে পারে না—এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই সরকার আগামী দিনগুলোতে এগিয়ে যেতে চায়।

পরিশেষে বলা যায়, ছয় নবজাতকের মৃত্যু আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য কাঠামোর এক গভীর ক্ষত। এই ক্ষতের বিচার না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি যেন কেবল মৌখিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও প্রতিটি হাসপাতালের মান নিশ্চিত করার মাধ্যমে তা প্রতিফলিত হয়—এমনটাই এখন দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দাবি। সরকার যদি পরিকল্পিত উপায়ে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর উন্নয়ন এবং শিশু মৃত্যুর কারণগুলোকে নির্মূল করতে পারে, তবেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন আশা করে যে, স্বাস্থ্য খাতের এই সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত