নাটোর পৌরসভায় অন্ধকার: সড়কবাতি বিকল, বাড়ছে আতঙ্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার
নাটোর পৌরসভায় অন্ধকার: সড়কবাতি বিকল, বাড়ছে আতঙ্ক

প্রকাশ: ৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নাটোর, ঐতিহ্যের শহর হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভার জনজীবন এক চরম সংকটের মুখে পড়েছে। শহরের প্রধান সড়কগুলোর আলোকসজ্জা ব্যবস্থা এখন শুধুই নামেমাত্র। অথচ এই শহরকে আলোকিত করার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ডিভাইডার সড়কের দুই পাশে স্থাপন করা হয়েছিল আধুনিক প্রযুক্তির ২৫০টি এলইডি বাতি। কিন্তু দুঃখজনক হলো, স্থাপনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় এই বাতিগুলোর এক-তৃতীয়াংশ অকেজো হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নাটোর পৌরসভায় প্রবেশের প্রধান দুটি পথ দিঘাপতিয়া ও হরিশপুর এলাকা এখন সন্ধ্যা নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। এই সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা এখন স্থানীয়দের কাছে এক ‘ভুতুড়ে’ পরিবেশের সমার্থক হয়ে উঠেছে, যেখানে ছিনতাই ও সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের সঙ্গী।

গত চার মাস ধরে এই অন্ধকারচ্ছন্ন পরিস্থিতির কবলে পড়ে শহরবাসী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দিঘাপতিয়া থেকে মাদ্রাসা মোড় এবং হরিশপুর থেকে চকরামপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকাটি জেলা প্রশাসকের বাসভবন এবং সদর উপজেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর খুব কাছে অবস্থিত। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই এলাকাগুলো রাতে অরক্ষিত হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থ খরচ করে যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল, তা দীর্ঘ চার মাস ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন। অন্ধকার রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে উত্তরা গণভবন সংলগ্ন মহাসড়কে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

পৌর এলাকার নিরাপত্তার প্রশ্নে স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। উপজেলা পরিষদ এলাকার বাসিন্দা আবু সাঈদ জানান, অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকাগুলোতে নিয়মিত ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। শামীম নামের আরেকজন ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, যেখানে উত্তরায় গণভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস এবং ব্যস্ততম মহাসড়ক রয়েছে, সেখানে দিনের আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সড়কের বাতিগুলো অকেজো থাকায় মহাসড়কে ওঠার সংযোগ সড়কগুলোতে প্রায়ই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছে। অথচ এই শহরটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়ার পরও তাদের সাধারণ মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অথচ এই বাতি স্থাপনের মাত্র এক মাসের মাথায় সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের কাজ অথবা রক্ষণাবেক্ষণ ত্রুটির কারণে এমনটি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ বা ওয়ারেন্টি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার কোনো প্রতিফলন নেই। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ গত দেড় মাস আগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়ার কথা জানালেও তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। কাজের কাজ কিছুই হয়নি, বাতিগুলো আজও নিভে আছে। জনগণের করের টাকায় কেনা বাতিগুলোর এই করুণ দশা দেখে সাধারণ মানুষ মনে করছেন, জবাবদিহিতার অভাবে এই প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।

নাটোর পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের বক্তব্যও হতাশাজনক। তিনি জানান, ঠিকাদারকে পুনরায় চিঠি দেওয়া হবে এবং দ্রুত মেরামত না হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এই ‘চিঠি দেওয়া’ আর ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ আশ্বাস গত চার মাস ধরে শুনছেন পৌরবাসী। এর ফলে বাতিগুলো জ্বলছে না, বরং অন্ধকারে ডুবে থাকা শহরের প্রতিটি কোণ হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। শহরের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পৌরসভার প্রধান দায়িত্ব। অথচ প্রায় দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পরও কেন এই প্রকল্পের টেকসই মান নিশ্চিত করা সম্ভব হলো না—সেই প্রশ্ন আজ শহরবাসীর মুখে মুখে। রক্ষণাবেক্ষণের এই দীর্ঘসূত্রতা ও অবহেলা নাটোর পৌরসভার প্রশাসনিক সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

শহরের এই অন্ধকার দশা কেবল একটি যান্ত্রিক সমস্যা নয়, এটি স্থানীয় শাসনের ব্যর্থতার একটি প্রতীক। একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভার বাসিন্দারা যখন রাস্তার আলোটুকু পাওয়ার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা করেন, তখন উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল নিয়ে বড়ই সংশয় তৈরি হয়। বাতিগুলোর এই নীরবতা যেন শহরের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্যহীনতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ছিনতাই, চুরি ও সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে এবং শহরকে পুনরায় আলোকিত করতে এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে বাতিগুলো সচল করা প্রয়োজন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দায় এড়াতে পারে না, আবার পৌরসভাও তাদের তদারকির দায় কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি বাতি সচল করা এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো বাতি অকেজো না হয়, সেজন্য একটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা তৈরি করতে হবে। শহরের প্রতিটি মানুষ চায় রাতের অন্ধকারেও তাদের শহরটি যেন নিরাপদ থাকে। সড়কবাতিগুলো কেবল আলো দেয় না, এগুলো শহরের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নাটোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যদি অনতিবিলম্বে এই ‘ভুতুড়ে’ পরিবেশ থেকে শহরবাসীকে মুক্তি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে জনরোষ আরও বাড়বে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে দ্রুত নাটোর শহরের প্রধান সড়কগুলোকে পুনরায় আলোকিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব, যা আর দেরি করা উচিত নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত