প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন পালক যুক্ত হলো। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই নির্বাচনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও নেতৃত্বের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এক গোপন ব্যালট ভোটের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ফলাফল নির্ধারিত হয়। নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে পরাজিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জয়লাভ করেন। কাস্টিং হওয়া ১৯০টি ভোটের মধ্যে ড. খলিলুর ৯৯টি ভোট পেয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কাকোরিস পান ৯১টি ভোট। এই জয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে অভিনন্দন বার্তা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন আনুষ্ঠানিকভাবে ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক বার্তায় মার্কিন দূত বলেন, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন। যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি তাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকার মতো একটি পরাশক্তির কাছ থেকে আসা এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই অধিবেশনটি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিবেশন শুরুর দুই সপ্তাহ পরেই বিশ্বনেতারা বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সমবেত হবেন। সেই উচ্চপর্যায়ের সভার সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক সংঘাত, মানবিক সংকট এবং টেকসই উন্নয়নের মতো জটিল বিষয়গুলো এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্ব এই সংকটময় সময়ে বিশ্বের জন্য নতুন দিশা দেখাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। ১৯০টি ভোটের প্রতিটিই ছিল গুরত্বপূর্ণ, যেখানে কোনো ভোট বাতিল হয়নি এবং কেউ ভোটদান থেকে বিরত থাকেননি। এটি প্রমাণ করে যে সদস্য রাষ্ট্রগুলো নির্বাচনের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিল এবং প্রতিটি দেশের ভোটাধিকার প্রয়োগ ছিল সক্রিয়। ৯৯ বনাম ৯১ ভোটের এই ব্যবধানই বলে দেয় যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ এখন কতটা জোরালো অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। এই ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি পদমর্যাদা নয়, বরং এটি বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের দায়িত্বকে আরও বাড়িয়ে দিল। ড. খলিলুর রহমানের ওপর অর্পিত এই গুরুদায়িত্ব পালনে তিনি কতটা দক্ষ, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সারা বিশ্ব।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য গর্বের বিষয়। একজন বাংলাদেশি যখন বৈশ্বিক কোনো সংস্থায় সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে বসেন, তখন তা দেশের মর্যাদা ও ভাবমূর্তিকে বহির্বিশ্বে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ড. খলিলুর রহমান অতীতেও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। এবারের এই নির্বাচন প্রমাণ করল যে, বিশ্বের ছোট-বড় সব দেশই বাংলাদেশের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে চায়। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে যখন নানা ধরনের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন একটি নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক দক্ষতা সেই প্রয়োজনীয়তা পূরণে সহায়ক হবে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. খলিলুর রহমানের সামনে থাকবে নানা চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি সংকটের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে তাকে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা প্রশমনে তাকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হতে পারে। তবে তার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ক্যারিয়ার ও ধৈর্যশীল স্বভাব তাকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে রাখবে। তিনি যে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, এই সাফল্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের কথা শোনা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ এখন বিশ্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশীদার। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে যখন ড. খলিলুর রহমান সভাপতির আসন থেকে অধিবেশন পরিচালনা করবেন, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ হবে বিশ্ববাসীর নজরকাড়া। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই খবরে আনন্দিত ও গর্বিত। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই গৌরবময় অর্জনের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানায়। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, তার যোগ্য নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠবে, যা বিশ্ব শান্তির পথে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।