প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের সবচেয়ে জমকালো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ আইপিএলকে কেন্দ্র করে বিতর্ক যেন থামছেই না। এবার আইপিএলের অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে পারিশ্রমিক বঞ্চনার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার মিচেল স্যান্টনার। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম ভদ্র এবং শান্ত খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত স্যান্টনারের এই অভিযোগ ক্রিকেট মহলে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। চোটের কারণে টুর্নামেন্টের মাঝপথে ছিটকে পড়ার পর যেভাবে তাকে পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা কেবল আইপিএলের নিয়মনীতির পরিপন্থী নয়, বরং খেলোয়াড় ও ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যেকার পেশাদার সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের কালো দাগ ফেলেছে। একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে দলের প্রয়োজনে নিজের শরীরকে বাজি রেখে খেলার পরও এমন বৈষম্যমূলক আচরণ স্যান্টনারকে মানসিকভাবে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের আইপিএল মৌসুম থেকে। নিউজিল্যান্ডের হয়ে ১৩৮টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ৩৪ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডারকে ২০২৫ সালের মেগা নিলামে ২ কোটি রুপিতে দলে ভিড়িয়েছিল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে তাকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য ধরে রাখা হয়। কিন্তু এবারের আইপিএল মৌসুমটি ছিল স্যান্টনারের জন্য এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো। মৌসুমের শুরুতেই দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের কারণে তিনি প্রথম ম্যাচটি মিস করেন। তবে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে তিনি সরাসরি বিমানবন্দর থেকে নেমেই দিল্লির বিরুদ্ধে মাঠে নামেন। সেই ম্যাচেই দুর্ভাগ্যবশত তার ডান কাঁধে গুরুতর চোট লাগে। চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রায় এক সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। কিছুটা সুস্থ হয়ে দলে ফিরে আসার পর দ্বিতীয়বার বাঁ কাঁধে চোট পান তিনি। পরপর দুই কাঁধের চোটে বিপর্যস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে টুর্নামেন্ট ছেড়ে দেশে ফিরে যেতে হয়।
স্যান্টনারের এই চোটের সময়কাল নিয়ে ক্রিকেট মহলের একটি অংশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেরই অভিযোগ ছিল যে, তিনি হয়তো আইপিএল থেকে বিরতি নেওয়ার জন্য চোটের অজুহাত দেখিয়েছিলেন। তবে এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্যান্টনার। বিখ্যাত ‘গ্রেড ক্রিকেটার’ পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে জানিয়েছেন যে, তিনি দলের জন্য নিজের শরীরকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, কিন্তু বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন বঞ্চনা। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাকে চুক্তিবদ্ধ পারিশ্রমিকের মাত্র অর্ধেক প্রদান করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। আইপিএলের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট চলাকালীন কোনো খেলোয়াড় যদি চোটের কবলে পড়েন, তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের নির্ধারিত পুরো পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে। সেক্ষেত্রে স্যান্টনারের এই অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ম্যানেজমেন্টের পেশাদারিত্বের অভাবকেই নির্দেশ করে।
খেলোয়াড়দের জন্য চোট সবসময়ই একটি বড় অভিশাপ। মাঠের বাইরে থাকা একজন খেলোয়াড় মানসিকভাবে যে লড়াই করেন, তার খোঁজ খুব কমই রাখেন ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তারা। স্যান্টনার আক্ষেপ করে বলেন যে, তিনি ভেবেছিলেন দলের প্রতি তার এই নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতা হয়তো স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টোটা। কাঁধের চোট নিয়ে খেলার ঝুঁকি নেওয়া একজন খেলোয়াড়কে এভাবে পারিশ্রমিক কমিয়ে দেওয়া কেবল আইন অমান্য করা নয়, বরং এটি খেলোয়াড়দের আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত। নিউজিল্যান্ডের হয়ে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এমন অভিজ্ঞতা তিনি আগে কখনো পাননি। বিশেষ করে ভারতের মাটিতে আইপিএল খেলার স্বপ্ন দেখা একজন বিদেশী খেলোয়াড় যখন এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হন, তখন তা বিশ্ব ক্রিকেটের ভাবমূর্তির জন্যই নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
বর্তমানে স্যান্টনার চোট কাটিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং বৃহস্পতিবার (৪ জুন) থেকে শুরু হওয়া ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের জন্য নিউজিল্যান্ড দলে ডাক পেয়েছেন। প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত সেরে ওঠা প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল খেলার জন্যই নয়, বরং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কতটা মরিয়া ছিলেন। তার এই দ্রুত সুস্থ হওয়ার বিষয়টিই প্রমাণ করে যে, আইপিএল ছাড়ার কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ বা অজুহাত তার ছিল না। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এই বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে স্যান্টনারের মতো একজন আন্তর্জাতিক তারকার এই অভিযোগের পর আইপিএলের দুর্নীতি দমন এবং খেলোয়াড় কল্যাণ বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আইপিএলের মতো একটি বড় আসরে এমন অর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাববার খোরাক দিয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের বাণিজ্যিক মানসিকতা কি দিন দিন খেলোয়াড়দের মানবিক দিকটিকে পিষ্ট করছে? স্যান্টনারের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করা হলেও, বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই একজন সঠিক মালিকের পরিচয়। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স কি সত্যিই কোনো ভুল করেছে, নাকি এটি একটি বড় ধরনের ভুল বোঝাবুঝি, তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। যদি এটি কোনো ইচ্ছাকৃত গাফিলতি হয়ে থাকে, তবে তা বিসিসিআই ও আইপিএল গভর্নিং বডির কঠোর নজরদারিতে আসা উচিত।
ক্রিকেট মাঠে যখন একজন খেলোয়াড় ইনজুরিকে সঙ্গী করে লড়েন, তখন তিনি দলের জয় এবং নিজের দেশের মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যেই তা করেন। পারিশ্রমিকের অর্ধেক টাকা কেটে নেওয়া একজন ক্রিকেটারের জন্য কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি তার কঠোর পরিশ্রমের অমর্যাদা। স্যান্টনারের এই সাহসী কণ্ঠস্বর এখন অন্যান্য খেলোয়াড়দের মধ্যেও সাহস জোগাবে। ভবিষ্যতে কোনো খেলোয়াড় যেন এমন বঞ্চনার শিকার না হয়, তার জন্য আইপিএলের নিয়মনীতিগুলো আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করা প্রয়োজন। একজন অলরাউন্ডার হিসেবে তার এই দুঃসময়ের কথা ক্রিকেট অনুরাগী এবং নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছানো জরুরি। আশা করা যায়, আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে এবং স্যান্টনার তার প্রাপ্য সম্মান ও পারিশ্রমিক ফিরে পাবেন। এই ঘটনাটি আইপিএলের ব্যবস্থাপনায় নতুন করে স্বচ্ছতা আনার দাবি জানাচ্ছে, যাতে খেলোয়াড়রা কেবল পণ্য নয়, বরং প্রকৃত পেশাদার হিসেবে বিবেচিত হয়।