খুমেক হাসপাতালে অচল ওটি: সংকটে শতাধিক রোগী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
  • ৮ বার
খুমেক হাসপাতালে অচল ওটি: সংকটে শতাধিক রোগী

প্রকাশ: ৪ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার এখন এক নীরব যন্ত্রণার নাম। দুই সপ্তাহ আগে ঘটা একটি অগ্নিকাণ্ড কেবল হাসপাতালের অবকাঠামোই পুড়িয়ে দেয়নি, বরং অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে শতাধিক মুমূর্ষু রোগীর জীবন। হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ স্টোর রুমে লাগা সেই আগুন আজ পুরো অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাকে অচল করে রেখেছে। অথচ একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকা মানে শত শত রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত সংস্কারের নির্দেশনা আসলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন এখনো অধরা। ফলে হাসপাতালের করিডোরে দীর্ঘ হচ্ছে অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা অসহায় রোগীদের সারি।

সবচেয়ে মর্মান্তিক অবস্থার শিকার হচ্ছেন যারা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। সাতক্ষীরার রেশমা আক্তারের কথা ধরা যাক, যিনি দীর্ঘ দেড় মাস ধরে ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। অন্তঃসত্ত্বা এই নারীর শারীরিক অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক। অপারেশনের নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাত তুলে নিয়েছে। রেশমার মতো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল রোগীদের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজই শেষ ভরসা, কারণ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তাদের নেই। একইভাবে সার্জারি, নিউরো সার্জারি, ইউরোলজি এবং বার্ন ইউনিটের শত শত রোগী আজ দিশেহারা। নতুন রোগীদের ভর্তি না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ায় তারা এখন কোথায় যাবেন, সেই উত্তর কারো কাছেই নেই।

হাসপাতালের চিকিৎসকরাও চরম অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন। অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. দিলীপ কুমার কুণ্ডু জানান, অপারেশন বন্ধ থাকার ফলে রোগীদের শারীরিক জটিলতা কেবল বাড়ছেই না, কিছু ক্ষেত্রে এটি সরাসরি মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। নিউরো সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রিয়াজ আহমেদ বারবার সতর্ক করছেন যে, অস্ত্রোপচারের দেরি হওয়ার কারণে রোগীদের অবস্থা প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে। যে রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে টেবিল পর্যন্ত নেওয়ার কথা ছিল, তাদের কেবল মৃত্যুর অপেক্ষায় ফেলে রাখা চিকিৎসকদের জন্যও এক চরম মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা হুমকি হতে পারে, তা এই পরিস্থিতি না দেখলে অনুধাবন করা কঠিন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং গণপূর্ত বিভাগের অসহযোগিতার যে চিত্র উঠে আসছে, তা রীতিমতো হতাশাজনক। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকার পরেও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ বা অ্যাসেসমেন্টের অজুহাতে কাজ আটকে থাকা প্রশাসনিক ব্যর্থতারই পরিচয় দেয়। হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলছেন যে, কারিগরি জটিলতার কারণে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে, গণপূর্ত বিভাগ বলছে ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম অপসারণ না হওয়ায় তারা কাজ শুরু করতে পারছে না। এই দুই দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম আগামী ২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা এই সংকটময় মুহূর্তে রোগীদের কাছে কেবল একটি সান্ত্বনা বাক্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

অগ্নিকাণ্ডের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন থিয়েটার সচল করার জন্য যে ধরনের সক্রিয়তা প্রয়োজন ছিল, তার অভাব এই ঘটনায় প্রকট। হাসপাতাল হলো এমন একটি জরুরি সেবাকেন্দ্র, যেখানে সময়ের মূল্য জীবন দিয়ে মাপতে হয়। সেখানে ২০ দিন বা তার বেশি সময় অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যে কোনো মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিকল্প অপারেশন থিয়েটার বা অস্থায়ী ওটি ব্যবস্থা দ্রুত চালু করার মতো প্রযুক্তি বা সক্ষমতা হাসপাতালের থাকার কথা ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত খুমেক হাসপাতালের ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না।

এই মানবিক সংকট কেবল খুলনা অঞ্চলের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সরকারি হাসপাতালের প্রতিটি অবকাঠামো জনগণের অর্থে তৈরি, তাই এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার বিষয়টি দায়বদ্ধতার অন্তর্ভুক্ত। অগ্নিকাণ্ডের পর যথাযথ তদন্ত হয়েছে কি না বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের কোনো দায় আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত রোগীদের জীবনের নিরাপত্তা। অহেতুক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দপ্তরে দপ্তরে ফাইল চালাচালি বন্ধ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপারেশন থিয়েটার সচল করা এখন সময়ের দাবি।

আমরা বিশ্বাস করি, সরকার এই সংকটের ভয়াবহতা অনুধাবন করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। যদি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না করা যায়, তবে হয়তো অনেক রোগীকেই শেষ পরিণতি বরণ করতে হবে, যা কারো কাম্য নয়। গণপূর্ত বিভাগ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তাদের পারস্পরিক দায় এড়ানোর খেলা বন্ধ করে সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করতে হবে। কারণ, হাসপাতালের ওটি টেবিল কেবল লোহা আর ইস্পাতের সরঞ্জাম নয়, এটি অনেকের কাছে বেঁচে থাকার শেষ আশা। এই আশার প্রদীপ যেন অহেতুক গাফিলতিতে নিভে না যায়, তা নিশ্চিত করার দায় এখন কর্তৃপক্ষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত