প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী বাজারের বুক চিরে আজ ভোরে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তাণ্ডব বয়ে গেল, তা কেবল কিছু দোকানের ধ্বংসাবশেষই রেখে যায়নি, বরং কেড়ে নিয়েছে অন্তত অর্ধশত ব্যবসায়ী পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। শুক্রবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে যখন গোটা এলাকাটি ভোরের প্রশান্তিতে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ স্পর্শ করতে শুরু করে। বাতাসের তীব্রতায় আগুনের তীব্রতা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বাজারের প্রতিটি কোণে। যে বাজারটি ছিল কয়েক হাজার মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার প্রাণকেন্দ্র, তা যেন নিমেষেই পরিণত হলো এক বিশাল শ্মশানে। আগুনের এই তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্তরা এখন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কেবল তাদের হারানো সম্পদ খুঁজছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভোরের আলো ফোটার আগেই বাজারের কোনো এক প্রান্ত থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন আশেপাশের কাপড়ের দোকান, কসমেটিকস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। দাহ্য বস্তু থাকায় আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে, আর বাতাসের কারণে সেই আগুনের শিখা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাজারের ব্যবসায়ীরা যখন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান, ততক্ষণে তাদের সারাজীবনের উপার্জিত সম্পদ আগুনের গ্রাসে পরিণত হয়েছে। কান্না ও হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। কারো দোকানের মালামাল পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কেউবা আবার অবশিষ্ট কিছু রক্ষার শেষ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় নিজস্ব কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই। এই অভাবটি আজ প্রতিটি ব্যবসায়ী হাড়িয়ে টের পেলেন। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পাশের নাগেশ্বরী উপজেলা থেকে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের তীব্রতা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, দোকানগুলোর কাঠামো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। যদি নিজস্ব ফায়ার স্টেশন থাকত এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যেত, তবে হয়তো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটা ভয়াবহ হতো না। দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস না থাকার এই ব্যর্থতা আজ ভূরুঙ্গামারীর ব্যবসায়ীদের জন্য এক চরম মূল্য হিসেবে হাজির হয়েছে।
প্রাথমিক হিসেবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। কাপড়ের দোকান, প্রসাধনী সামগ্রী, ফলের দোকান এবং মুদি দোকানগুলো ছিল এই বাজারের মূল ভিত্তি। ঈদ বা বিশেষ উৎসব সামনে রেখে অনেকেই নতুন করে মালামাল তুলেছিলেন। সেই সব পণ্য আজ কয়লায় পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা, বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকেই হয়তো এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। যদিও প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য তদন্ত চলছে, কিন্তু শর্টসার্কিট জনিত দুর্ঘটনার কথা শুনতে শুনতে এলাকাবাসী এখন ক্লান্ত। প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পেছনেই যেন এই শর্টসার্কিটকে দায়ী করা হয়, কিন্তু বাজারের বৈদ্যুতিক সংযোগগুলো কেন নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না বা কেন অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা প্রতিটি দোকানে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয় না—সেই প্রশ্নগুলো আজ বড় হয়ে সামনে আসছে।
এই ঘটনায় ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ জানিয়েছেন যে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় এবং আগুনের কারণ অনুসন্ধানে কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবতা হলো, এই পরিবারগুলো যে মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, তা সহজে কাটবার নয়। অনেকেই ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এই আগুনের ফলে তাদের ঋণের বোঝা এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এখন এই ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দরকার শুধু সরকারি অনুদান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই অগ্নিকাণ্ডটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি একটি এলাকার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনা। বাজারের সাথে জড়িত প্রতিটি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে এবং বাজারের চারপাশের দোকানগুলোর ওপর নির্ভরশীল অগণিত পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারের এই করুণ দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন। আগুনের লেলিহান শিখা কেবল দোকান পোড়ায়নি, পুড়িয়েছে কয়েকশ মানুষের স্বপ্ন। আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থাপনায় আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি পানির উৎস এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ লাইন পরীক্ষা করার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। ভূরুঙ্গামারীর এই দুর্ঘটনা যেন আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে। আসুন, আমরা সকলে মিলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ভাইদের পাশে দাঁড়াই এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতন হই।