প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে দেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য নতুন করে যে বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা একদিকে যেমন সরকারের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজেট প্রণয়নের সময় প্রতিবারই রাজস্ব আহরণের চাকা সচল রাখতে করের ক্ষেত্র বিস্তৃত করার কথা বলা হয়। তবে এবারের প্রস্তাবিত বিশাল লক্ষ্যমাত্রা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা এনবিআরের জন্য কেবল বড় চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি অর্থনীতির নানা খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার জন্য এই অর্থের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও, আদায়ের প্রক্রিয়াটি যদি জনবান্ধব না হয়, তবে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা অমূলক নয়। বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় যে বিশাল উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ বের করে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের তুলনায় নতুন অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটের সিংহভাগ অর্থ জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে ভ্যাটের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রায় ৩৮ শতাংশ। ভ্যাট সাধারণত পরোক্ষ কর হিসেবে গ্রাহক পর্যায়ে পড়ে, তাই নিত্যপণ্যের দামের ওপর এর প্রভাব সরাসরি অনুভূত হয়। বাজারদরের এই অস্থিরতার মধ্যে ভ্যাটের বোঝা আরও ভারী করা হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যখন করের হার যোগ হয়, তখন মুদ্রাস্ফীতির বোঝা সামাল দেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, আয়কর ও ভ্রমণ খাত থেকেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই খাত থেকে মোট রাজস্বের ৩৭ শতাংশ আদায়ের পরিকল্পনা করেছে সরকার, যা আগের তুলনায় প্রায় ৪৭ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৩০ কোটি থেকে বাড়িয়ে এটিকে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এর বাইরে আমদানি ও রফতানি শুল্ক খাতে ২৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করে মোট ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শুল্ক হার বাড়লে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে উৎপাদনী শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় করা সম্ভব নয়। অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকার যে বড় পরিকল্পনা বা বিগ পুশ নিচ্ছে, তা কার্যকর করতে হলে সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন। রাতারাতি বড় ধরনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। বরং ধীরে ধীরে করের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমাদের দেশে যারা নিয়মিত কর দেন, তারা প্রতিনিয়ত চাপের মুখে থাকছেন, অথচ বিশাল একটি গোষ্ঠী এখনও করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। যারা কর দেন না তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই হওয়া উচিত রাজস্ব আদায়ের মূল পথ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া নিয়মিত করদাতাদের নিরুৎসাহিত করার শামিল। যখনই করের হার বাড়ানো হয়, তখন কর ফাঁকির প্রবণতা বাড়ে। এনবিআরকে যদি ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হয়, তবে ভ্যাট ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পুরো কর কাঠামোতে ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করতে হবে। ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ অনলাইন বা অটোমেশন প্রক্রিয়ায় কর আদায় করা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব চুরির সম্ভাবনা কমবে। এছাড়া করদাতাদের হয়রানি কমিয়ে একটি বন্ধুসুলভ পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় কর প্রদানে আগ্রহী হয়।
বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করা সরকারের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু সেই সম্পদ আহরণের প্রক্রিয়া যেন দেশের সাধারণ মানুষের জন্য শোষণের কারণ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। করের বোঝা বাড়লে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকে। করপোরেট কর ও আমদানি শুল্কের বাড়তি চাপ দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পায়ন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ সংকুচিত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হবে।
সামগ্রিকভাবে, রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারকে কেবল কঠোর হওয়ার চেয়ে কৌশলগত হওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি এবং কর প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা বজায় রাখাই হতে পারে টেকসই রাজস্ব আহরণের চাবিকাঠি। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে যদি করের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তবেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। দেশের উন্নয়নের পথে রাজস্ব প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন সাধারণ মানুষের জীবনের মানকে আরও কঠিন করে না তোলে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আগামী বাজেটে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় পরীক্ষা।