সর্বশেষ :
কলকাতা থেকে পরিচালিত অপারেশন: আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের অপচেষ্টা ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ছক দেউলিয়া থেকে ডাটা কিং: রবিন খুদার AirTrunk সাম্রাজ্যের ওয়াল স্ট্রিট গল্প আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ সংসদে ১১ জুন পেশ হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ইউনূস ও নূরজাহানসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন: আদেশ অপেক্ষমাণ জেলায় জেলায় ভুয়া কমিটি নিয়ে বিএনপির সতর্কবার্তা আইনি লড়াই শেষে কাজে ফিরছেন অভিনেতা কিম সু-হিউন লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি হানিফ আমিনবাজার ভূমি অফিসে অনুপস্থিত কর্মকর্তা, প্রতিমন্ত্রীর ক্ষোভ ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহক ফোরামের কলমবিরতি: অচলাবস্থায় সেবা কার্যক্রম

পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ১২ বার
পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ:  ০৮ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা এবং লাশ গুমের চেষ্টার ঘটনাটি সারা দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এই বীভৎস ও অমানবিক ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রোববার জনাকীর্ণ আদালতে এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আসামিদের বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, যা তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দেশের বিচারিক ইতিহাসে পাঁচ কর্মদিবসে বিচারকাজ শেষ করে রায় ঘোষণার এই ঘটনা এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ মে, যখন রাজধানীর পল্লবীতে ভাড়া বাসায় বসবাসরত দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী স্কুল থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয়। মেয়েটির মা তাকে খুঁজতে গিয়ে একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটের সামনে তার জুতা দেখতে পান। সন্দেহবশত তিনি ওই ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিলেও ভেতরে থাকা স্বপ্না আক্তার দরজা খোলেননি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সোহেল ও স্বপ্নার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। একই দিন স্বপ্নাকে আটক করা হলেও মূল অপরাধী সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে ঘটনার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো দেশ যখন শোক ও ক্ষোভে উত্তাল, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং নিহত শিশুটির পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন।

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। তবে দণ্ড কার্যকরের আগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্টের অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথি পাঠানো হয়েছে। বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা এবং লাশ গুমের চেষ্টার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণে শিশুটির হত্যার নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার যে বীভৎস রূপ প্রকাশ পেয়েছে, তা সভ্য সমাজের জন্য চরম অবমাননাকর। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি রক্ষার্থে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই অপরাধীদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ের সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা তাদের কৃতকর্মের পরিণতিবোধ থেকেই এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মামলার বিচারিক কার্যক্রম যে গতিতে এগিয়েছে, তা দেশের বিচার বিভাগের সক্ষমতার নতুন পরিচয় দিয়েছে। গত ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় আইনি লড়াই। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১ জুন আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং এরপর থেকে মাত্র পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করা হয়। রাষ্ট্রনিযুক্ত বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু এই দ্রুততম বিচার প্রক্রিয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন যে, নিহত শিশুর পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ জানান, অপরাধী স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর এই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে শিশুটির বাবা সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এই রায়ে শতভাগ সন্তুষ্ট এবং তার মনের আশা পূর্ণ হয়েছে। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই দ্রুত বিচার সম্ভব হয়েছে। সরকারও এই রায়ের দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বদ্ধপরিকর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ডেথ রেফারেন্স দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং সরকার অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টকে বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনার জন্য অনুরোধ করবে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আশা প্রকাশ করেছেন যে, সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগামী তিন মাসের মধ্যেই এই রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে।

এই বিচারের গুরুত্ব কেবল একটি মামলার রায়েই সীমাবদ্ধ নেই। পল্লবীর এই ঘটনাকে ঘিরে পুলিশ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের এক অনন্য নজির স্থাপন করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অভিযোগপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে পুলিশ যে তৎপরতা দেখিয়েছে, তা অন্যান্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কার্যকর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এছাড়া অপরাধীদের শনাক্ত ও দ্রুত আইনের আওতায় আনার এই উদ্যোগের জন্য পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এই বিচারিক মাইলফলক দেশের অন্যান্য চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রেও একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আদালত প্রাঙ্গণে রায় শুনতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল গভীর উত্তেজনা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা। রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করে কিন্তু সেই সঙ্গে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবিও জানায়। তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের নরপশুদের কোনো ক্ষমা নেই এবং দ্রুত ফাঁসির মঞ্চে তাদের তোলা না হলে অপরাধীদের সাহস বেড়েই চলবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জুব্বায়ের রহমান চৌধুরী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার আপিল দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা এই মামলার রায় কার্যকর ও বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে বড় ভূমিকা রাখবে। পল্লবীর এই শিশু হত্যাকাণ্ডের বিচার কেবল একটি দণ্ডাদেশ নয়, বরং এটি সমাজ থেকে সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার বিষবাষ্প দূর করার একটি দৃঢ় পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত