প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আরাফাতকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর একটি এলাকা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গ্রেপ্তার আরাফাত ভাঙ্গা উপজেলার কাওলিবেড়া ইউনিয়নের শেখপুরা গ্রামের বাসিন্দা।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শেখ আরাফাতের বিরুদ্ধে ভাঙ্গা থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে থানা ভাঙচুর, বিস্ফোরক দ্রব্য সংক্রান্ত অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত ঢাকা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে।
ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “আরাফাতের বিরুদ্ধে ভাঙ্গা থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে তাকে খুঁজছিল। ঢাকা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে আটক করেছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তবে অফিসিয়ালি কাগজপত্র এখনো হাতে পাইনি।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শেখ আরাফাত ভাঙ্গা উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আলোচিত ছিলেন। নিক্সন চৌধুরী আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও পরিচিত। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আরাফাত আত্মগোপনে চলে যান বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। তবে আত্মগোপনে থাকলেও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙ্গা এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে শেখ আরাফাতের নাম নতুন করে আলোচনায় আসে। কয়েক দিন আগে ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে যুবলীগের একটি ঝটিকা মিছিল বের হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা দাবি করেন, ওই মিছিল আরাফাতের নেতৃত্বে হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত শুক্রবার উপজেলা বিএনপি বিক্ষোভ করে। এরপর থেকে এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়।
ভাঙ্গা উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে ফরিদপুরের আলোচিত রাজনৈতিক এলাকা। স্থানীয় রাজনীতিতে নিক্সন চৌধুরী ও তার অনুসারীদের প্রভাব নিয়ে আগে থেকেই নানা আলোচনা ছিল। ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত নতুন গতি পায়। ফরিদপুরেও একই ধারায় একাধিক নেতা ও কর্মী গ্রেপ্তার হন। সেই প্রেক্ষাপটে শেখ আরাফাতের গ্রেপ্তারকে স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরাফাতের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ করেনি। তবে ভাঙ্গা থানা সূত্র বলছে, তার বিরুদ্ধে থানা ভাঙচুর এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলমান। আদালতে হাজির করার পর পুলিশ রিমান্ড চাইবে কি না, তা তদন্তকারী সংস্থা সিদ্ধান্ত নেবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, আরাফাত দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। তিনি সরাসরি এলাকায় না থাকলেও অনলাইনে অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল। পুলিশের দাবি, তার অবস্থান শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। পরে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, ভাঙ্গায় সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে এলাকায় অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। তাদের ভাষ্য, যারা মামলার আসামি বা আত্মগোপনে আছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শেখ আরাফাত বা তার পরিবারের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক নেতা এখন প্রকাশ্যে নেই। ফলে আরাফাতের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও জানা যায়নি। ভাঙ্গার রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে নীরবতা থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই গ্রেপ্তারের পর ভাঙ্গার আরও কয়েকটি মামলার তদন্তে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভাঙ্গায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, পুরোনো বিরোধ এবং মামলা নিয়ে উত্তেজনা ছিল। তাই পুলিশি অভিযানকে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে তারা চান, যেকোনো মামলায় তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয়। কেউ দোষী হলে আইন অনুযায়ী বিচার হোক। আবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গ্রেপ্তার ও মামলা অনেক সময় দলীয় উত্তেজনা বাড়ায়। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে এমন ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভাঙ্গার ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা রয়েছে। তাই পুলিশ এখন পরিস্থিতি নজরদারিতে রেখেছে বলে জানা গেছে। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে আছে।
শেখ আরাফাতের নাম স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। ভাঙ্গা উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি আগে থেকেই পরিচিত মুখ। অতীতেও তাকে ঘিরে নানা ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ফলে তার সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারকে শুধু একটি মামলার আসামি গ্রেপ্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি ভাঙ্গার রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
তবে আইনের চোখে গ্রেপ্তার মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। আদালতে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত যে কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হন। তাই শেখ আরাফাতের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত হবে। পুলিশের দায়িত্ব অভিযোগ তদন্ত করা। আর আদালতের দায়িত্ব প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া।
ডিবি পুলিশের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে সংশ্লিষ্ট মামলায় আদালতে পাঠানো হতে পারে। ভাঙ্গা থানা আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র পাওয়ার পর মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে আরাফাতের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভাঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে শেখ আরাফাতের গ্রেপ্তার ফরিদপুরের ভাঙ্গা রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশের দাবি, তিনি একাধিক মামলার আসামি এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং আদালতে মামলাগুলো কোন দিকে এগোয়।