দেশের টেকসই উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানীদের মৌলিক গবেষণায় আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব উদ্ভাবন এবং গবেষণার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং মৌলিক গবেষণায় আত্মনিয়োগ করা প্রয়োজন।
বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক বিজ্ঞান ও কৃষি গবেষণাবিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার এই যুগে কেবল প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই হবে না, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। যে দেশ গবেষণায় এগিয়ে থাকে, সেই দেশই অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিল্প খাতে নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশকেও সেই লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে।
তিনি বলেন, কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গবেষণার বিকল্প নেই। গত কয়েক দশকে দেশের কৃষি খাতে যে সাফল্য এসেছে, তার পেছনে বিজ্ঞানীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও গভীর ও মৌলিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, অনেক সময় গবেষণা কেবল বিদ্যমান তথ্য বিশ্লেষণ বা বিদেশি প্রযুক্তি অনুসরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়নের জন্য এমন গবেষণা দরকার, যা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দেবে। মৌলিক গবেষণা থেকেই যুগান্তকারী আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জন্ম হয়।
তিনি গবেষকদের উদ্দেশে বলেন, গবেষণাকে শুধু পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে। দেশের কৃষক, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গবেষণার ফল যেন সরাসরি কাজে লাগে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিজ্ঞানীরা বলেন, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা গেলে দেশের গবেষণা খাত আরও এগিয়ে যাবে। তারা গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে কাজ চলছে। একই সঙ্গে তরুণ গবেষকদের গবেষণায় আগ্রহী করে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট, পানিসম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং কৃষির আধুনিকায়নের মতো বিষয়গুলোতে নতুন নতুন গবেষণা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দেশীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে উদ্ভাবিত সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
বক্তব্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, একাডেমিক গবেষণা এবং বাস্তবমুখী গবেষণার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলে গবেষণার ফলাফল আরও দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষাবিদরা বলেন, গবেষণাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় অনুসন্ধানী মনোভাব এবং সৃজনশীল চিন্তাকে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে জ্ঞান ও উদ্ভাবনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই গবেষণা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণা দেশের অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন আবিষ্কার উপহার দেবেন এবং কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবেন।
অনুষ্ঠিানে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা গবেষণাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং গবেষণার ফল বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।