প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা বাজেটকে কেউ কেউ অবজ্ঞাসূচকভাবে ‘চানাচুর বাজেট’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে সরকারের দৃষ্টিতে এই বাজেট দেশের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের একটি বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা।
রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন। সরকার এমন একটি বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করেছে, যাতে সমাজের প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সরাসরি উপকৃত হয়।
তিনি বলেন, যেসব মানুষ প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি, কৃষি খাতে প্রণোদনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ এসব পদক্ষেপকে গুরুত্ব না দিয়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাজেটকে ছোট করার চেষ্টা করছেন।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সত্ত্বেও সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি, ভাতা প্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক চাপের সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ করা।
বাজেট নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা থাকতেই পারে। তবে সমালোচনা যেন তথ্যভিত্তিক ও গঠনমূলক হয়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য বাজেটকে বিদ্রূপ করা হলে জনগণের প্রকৃত স্বার্থের বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়।
তিনি বলেন, একটি বাজেটের সফলতা নির্ভর করে তার বাস্তবায়নের ওপর। সরকার উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুবসমাজের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও জনকল্যাণমূলক ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে এসব কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন কোনো বাজেট চায় না যা কেবল কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় দেখাবে কিন্তু বাস্তবে মানুষের কাজে আসবে না। বরং এমন বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে, যার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করার উদ্যোগও অব্যাহত থাকবে।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে বাজেট নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাজেটের সমালোচনা হোক, কিন্তু সেটি যেন তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে হয়। কারণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি সবার যৌথ দায়িত্ব।