দুই কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
দুই কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য টার্নওভার কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট খাতের বাইরে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক গ্রস প্রাপ্তি দুই কোটি টাকা পর্যন্ত হলে কোনো টার্নওভার কর দিতে হবে না। দুই কোটি টাকার বেশি আয় বা গ্রস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে করহার নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন। প্রজ্ঞাপনটি গেজেট আকারে প্রকাশের মাধ্যমে নতুন করব্যবস্থার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অন্যান্য প্রযোজ্য খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গ্রস প্রাপ্তি দুই কোটি টাকা পর্যন্ত হলে তাদের ওপর কোনো টার্নওভার কর আরোপ করা হবে না। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রস প্রাপ্তি দুই কোটি টাকার বেশি কিন্তু চার কোটি টাকার মধ্যে থাকলে ন্যূনতম টার্নওভার করহার হবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। আর চার কোটি টাকার বেশি গ্রস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে করহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১ শতাংশ।

এই সিদ্ধান্তকে দেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ টার্নওভার কর এমন একটি করব্যবস্থা, যা ব্যবসার মুনাফার ওপর নয়, বরং মোট বিক্রি বা লেনদেনের পরিমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ফলে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লাভ না করলেও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী তাকে টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হতে পারে। এ কারণে ব্যবসার প্রকৃত লাভ কম থাকা বা লোকসানে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই কর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে টার্নওভার করের কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে মোট বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বড় হলেও প্রকৃত মুনাফার হার অনেক কম হতে পারে। ব্যবসার ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক সুদ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত লাভ অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়।

এ অবস্থায় মোট লেনদেনের ওপর কর আরোপের ফলে ব্যবসার নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রস প্রাপ্তিকে টার্নওভার করের আওতার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত এ ধরনের চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

এর আগে অর্থ আইন, ২০২৬-এ টার্নওভার করহার ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের পর ব্যবসায়ী মহলে করের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যাদের বিক্রি তুলনামূলক বেশি কিন্তু মুনাফার হার কম, তাদের জন্য একক হারে ১ শতাংশ টার্নওভার কর একটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক দায়ে পরিণত হতে পারে—এমন আলোচনা সামনে আসে।

পরবর্তী সময়ে সরকার টার্নওভার করহার নিয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন কাঠামো নির্ধারণ করেছে। এর ফলে করব্যবস্থায় একটি স্তরভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলো। অর্থাৎ সব ব্যবসার ওপর একইভাবে কর আরোপ না করে গ্রস প্রাপ্তির পরিমাণ বিবেচনায় এনে করের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে নতুন এই করহার সব ধরনের ব্যবসা ও শিল্পের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে না। প্রজ্ঞাপনে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতকে এই সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিগারেট, বিড়ি, চিবিয়ে খাওয়ার তামাক, ধোঁয়াবিহীন তামাক, গুল এবং অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে কার্বোনেটেড বেভারেজ ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও এই নতুন সুবিধার আওতার বাইরে থাকবে।

মোবাইল ফোন অপারেটর এবং এনটিটিএন খাতের ক্ষেত্রেও এই নতুন করহার প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ এসব নির্দিষ্ট খাতের জন্য আলাদা করব্যবস্থা বহাল থাকবে বা তাদের ক্ষেত্রে নতুন প্রজ্ঞাপনের সাধারণ সুবিধা কার্যকর হবে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যবসার আকার, লাভের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব খাতের ব্যবসায়িক বাস্তবতা এক নয়। কোনো কোনো খাতে বিক্রির পরিমাণ বেশি হলেও লাভের হার কম, আবার কিছু খাতে তুলনামূলকভাবে উচ্চ মুনাফা থাকে। তাই করের ক্ষেত্রে একই নীতি সব খাতে প্রয়োগ করলে অনেক সময় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর অসম চাপ তৈরি হতে পারে।

নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে বিশেষ করে মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। দুই কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে টার্নওভার কর না থাকায় ক্ষুদ্র ও উদীয়মান ব্যবসাগুলোর পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্যোক্তারা অনেক সময় বাজার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বিনিয়োগে অর্থ ব্যয় করেন। এ সময়ে করের অতিরিক্ত চাপ কম থাকলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দুই কোটি থেকে চার কোটি টাকার মধ্যে গ্রস প্রাপ্তির জন্য শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করহার নির্ধারণ করায় মাঝারি ব্যবসার জন্যও তুলনামূলকভাবে কম হারে কর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর চার কোটি টাকার বেশি গ্রস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ১ শতাংশ করহার বহাল রাখা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের জন্য এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা। করব্যবস্থা যত সহজ, পরিষ্কার ও বাস্তবসম্মত হবে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা তত সহজ হবে। উদ্যোক্তারা তাদের আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগের হিসাব কর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করতে পারবেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। বাজারের দোকান, উৎপাদন প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সেবাখাত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে।

তাই করনীতিতে এমন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। নতুন টার্নওভার কর কাঠামোকে সেই ভারসাম্য তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে কর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু করহার কমানোই যথেষ্ট নয়; কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব করাও জরুরি। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জটিল হিসাব, নথিপত্র এবং করসংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে সমস্যায় পড়েন। ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার, সহজ কর নিবন্ধন এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের কর পরিশোধে আরও উৎসাহিত করতে পারে।

নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে করদাতার সংখ্যা, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি এবং নতুন কর কাঠামোর বাস্তবায়নের ওপর। করের হার তুলনামূলক কম হলেও ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থায় নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, দুই কোটি টাকা পর্যন্ত গ্রস প্রাপ্তিকে টার্নওভার করমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর করের চাপ কমানোর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এখন নতুন প্রজ্ঞাপনের বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে হয় এবং ব্যবসায়ীরা এর সুফল কতটা পান, সেটিই হবে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত