প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী চাহিদা চীনের রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেও উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি দেশটির অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। বিশেষ করে এআই তথ্যকেন্দ্রে ব্যবহৃত কম্পিউটার চিপ, যন্ত্রাংশ এবং প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা উৎপাদকদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও।
চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা বেড়েছে। তবে বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হয়েছিল। সে হিসাবে বছরের শুরুতে যে প্রবৃদ্ধির গতি ছিল, পরবর্তী সময়ে তা কিছুটা কমেছে।
প্রবৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান চীনের অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে স্বস্তি ও সতর্কতার বার্তা বহন করছে। একদিকে রপ্তানি ও উৎপাদন খাতের শক্তিশালী কার্যক্রম অর্থনীতিকে সহায়তা করছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, আবাসন খাত এবং বিনিয়োগের দুর্বলতা এখনো কাটেনি। ফলে কেবল রপ্তানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
চলতি বছরের জন্য চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। তৃতীয় প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের অর্থ হলো, দেশটি আপাতত লক্ষ্যমাত্রার নিম্নসীমায় রয়েছে। বছর শেষে এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাকি সময়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, উৎপাদন, রপ্তানি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সরকারকে একদিকে উৎপাদন ও রপ্তানির ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে মানুষের ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এআই প্রযুক্তির প্রভাব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা, উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং বড় তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের চাহিদা বাড়ছে। এসব অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার চিপ, সার্ভার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, শীতলীকরণব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশ। এ ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে চীনের শিল্প খাতের ভূমিকা দেশটির রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
এআই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে শুধু সফটওয়্যার বা ডিজিটাল সেবার বাজারই বড় হচ্ছে না, বরং এর পেছনে প্রয়োজনীয় বাস্তব অবকাঠামো নির্মাণেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তথ্যকেন্দ্রের জন্য সার্ভার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উপাদানের চাহিদা বাড়ায় উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীন নতুন সুযোগ পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে পারলে উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়, কর্মসংস্থান এবং শিল্প কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল চীনের অর্থনীতির সব খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না। রপ্তানিমুখী উৎপাদন ও উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প খাত ভালো করলেও সাধারণ মানুষের কেনাকাটা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা এখনো দুর্বল। দীর্ঘদিন ধরে আবাসন খাতে চলা সংকট, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি এবং তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব ভোক্তাদের ব্যয় করার আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ভেতরের বাজারের পরিবর্তে বিদেশি ক্রেতাদের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
চীনের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা এখন আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট। বছরের পর বছর প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বাড়ি নির্মাণ, বেসরকারি আবাসন কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ঋণ এবং সম্পত্তির বাজারে আস্থার ঘাটতির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও খাতটিতে বিনিয়োগের পতন অব্যাহত রয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে চীনের আবাসন খাতে বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নির্মাণশিল্প, সংশ্লিষ্ট উৎপাদন খাত এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির দাম ও ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে সাধারণ পরিবারও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে সতর্ক থাকে। এর প্রভাব পড়ে আসবাবপত্র, গৃহস্থালি পণ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষক শিয়ানা ইউয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় দুর্বল থাকলেও উৎপাদনশিল্প এবং উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য রপ্তানি চীনের প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে। তবে আবাসন খাতের সংকট দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ক্রেতাদের আস্থাও দুর্বল রয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে ভোগব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কাজ নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিদেশে পণ্য ও সেবা বিক্রি থেকে আয় যখন বিদেশ থেকে কেনাকাটার ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়, তখন সেই পার্থক্যকে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বলা হয়। চীনের রপ্তানি বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছরের রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এত বড় উদ্বৃত্ত দেশটির উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতার পরিচয় দিলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
চীনের কম দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা অর্থনীতির উৎপাদকরা চাপের মুখে পড়ছেন। তাদের অভিযোগ, চীনা পণ্যের ব্যাপক সরবরাহ ও তুলনামূলক কম দাম স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে বাণিজ্যনীতি, শুল্ক এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চীনের রপ্তানি যত বাড়বে, ততই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সামাল দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে।
এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তথ্যকেন্দ্র, উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ভবিষ্যতে এআই সেবার চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে কিংবা বিনিয়োগের ব্যয় মেটানোর মতো আয় তৈরি না হলে প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ ধীর হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদাও প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে চীনের সরকার গত সেপ্টেম্বরে কিছু সহায়তামূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণের সুদ কমানো এবং বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ভর্তুকির মতো উদ্যোগ রয়েছে। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগের ব্যয় কমানো, আবাসন বাজারে চাহিদা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আগ্রহ, পরিবারের ব্যয় করার সক্ষমতা এবং বাজারের আস্থার ওপর।
চীনের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরছে। একদিকে উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে আবাসন খাতের সংকট এবং দুর্বল ভোগব্যয় অর্থনীতির বিস্তৃত পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে। রপ্তানি বাড়লেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমানভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির জন্য মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, ভোগব্যয় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের উন্নতি জরুরি।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও চীনের এই প্রবৃদ্ধির গুরুত্ব রয়েছে। চীন বড় উৎপাদনকেন্দ্র হওয়ায় দেশটির শিল্প কার্যক্রমের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তিপণ্যের দাম এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এআই অবকাঠামোর চাহিদা বাড়লে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে। বিপরীতে বাণিজ্যিক বিরোধ বাড়লে শুল্ক, সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বাজারে প্রবেশের বাধা আন্তর্জাতিক ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, এআই প্রযুক্তির বিস্তার চীনের অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা কত দিন বজায় থাকবে, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার ওপর। আবাসন খাতের সংকট কাটানো, ভোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই চীনের বর্তমান প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই ভিত্তি পেতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত