এস আলম গ্রুপের নজিরবিহীন অর্থপাচার কেলেঙ্কারি: বিশ্বজুড়ে তদন্তে উন্মোচিত বিলাসবহুল সাম্রাজ্য

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০৯ বার
এস আলম গ্রুপের নজিরবিহীন অর্থপাচার কেলেঙ্কারি: বিশ্বজুড়ে তদন্তে উন্মোচিত বিলাসবহুল সাম্রাজ্য

প্রকাশ: ১৩ অগাস্ট । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের করপোরেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও জটিল অর্থপাচারের এক কেলেঙ্কারি ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন তদন্ত। চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ— অন্তত নয়টি দেশে ৪৭০টিরও বেশি শেল কোম্পানি গড়ে তুলে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। যা দেশের জিডিপির প্রায় চার শতাংশ এবং আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পর্যায়ে স্থান পেয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই বিপুল অর্থপাচারের আড়ালে ছিল বিলাসবহুল ভিলা, পাঁচতারকা হোটেল, অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং বিদেশি নাগরিকত্ব কেনার মতো কর্মকাণ্ড। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সক্রিয় হওয়া অনুসন্ধান দল ১১৭টি দেশে সম্পদ ও বিনিয়োগের সন্ধান চালিয়ে অভাবনীয় তথ্য পেয়েছে— যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এত ব্যাপক আন্তর্জাতিক তল্লাশির ঘটনা।

ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস, তুরস্ক, জার্সি, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, আইল অফ ম্যান, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, ইতালি এবং দুবাইসহ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে এস আলম পরিবারের বিপুল সম্পদের প্রমাণ। এর মধ্যে ব্রিটেনে মাসুদের মেজ ছেলে আশরাফুল আলমের মালিকানায় ৭৫ কোটি টাকার ভিলা, দুবাইয়ে জামাতা বেলাল আহমেদের ছয়টি বিলাসবহুল ভিলা, সিঙ্গাপুরে শতকোটি ডলারের হোটেল ও বাণিজ্যিক ভবন এবং জার্সিতে পাঁচতারকা হোটেল অন্তর্ভুক্ত।

অর্থপাচারের ধরন ছিল অত্যন্ত জটিল। প্রতিটি দেশে গড়ে তোলা হয় আলাদা আলাদা শেল কোম্পানি, যেগুলো বাস্তবে একই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে ছিল। করস্বর্গ বা ট্যাক্স হেভেনে এই কোম্পানিগুলো নিবন্ধিত করা হয় মূলধন গোপন রেখে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে সাইফুল আলম ও তার স্ত্রীর নামে ১৯টি কোম্পানি নিবন্ধিত হয় ২০১৮-২০২১ সালের মধ্যে, যখন বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে এস আলম গ্রুপের প্রভাব ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

তদন্তে পাওয়া গেছে, সাইপ্রাসে নাগরিকত্ব পেতে মাসুদ পরিবার কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে এবং পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে। সিঙ্গাপুরে তাদের মালিকানায় রয়েছে ২১টিরও বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, একাধিক হোটেল, বাণিজ্যিক স্পেস ও শিপিং কোম্পানি— যার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি।

তুরস্কে মাসুদের দুই ভাইয়ের নামে ১০টি প্রিমিয়াম ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ইতালিতে সক্রিয় লেনদেন চলমান অ্যাকাউন্ট, এবং অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় বিনিয়োগের মাধ্যমে কেনা নাগরিকত্ব— সবই এই অর্থপাচার সাম্রাজ্যের অংশ।

বাংলাদেশে এস আলম গ্রুপের উত্থানের পেছনে ছিল ব্যাংক খাতে প্রভাব বিস্তার। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমর্থনে এই দখল সম্পন্ন হয়।

বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাইফুল আলম মাসুদ, তার স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ আত্মসাতের একাধিক মামলা করেছে। আদালতের নির্দেশে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। তবে তদন্ত চলমান, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত আর্থিক অপরাধে পরিণত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com