ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটই বড় ফ্যাক্টর

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটই বড় ফ্যাক্টর

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই আসনে এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। আর সেই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, ভোটার ও সম্প্রদায়ের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। ফলে জয়-পরাজয়ের সমীকরণে এই ভোট বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় উপনির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। বাজার, চায়ের দোকান কিংবা স্থানীয় আড্ডায় আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রার্থীদের অবস্থান, আগের নির্বাচনের ফলাফল এবং কোন প্রার্থী কোন এলাকার ভোটে এগিয়ে যেতে পারেন—এসব প্রশ্ন। বিশেষ করে হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের প্রচারণা জোরালো হয়েছে।

ভূল্লী উপজেলার বালিয়া বাজারের একটি সাধারণ আড্ডাতেও উঠে আসে সেই ভোটের হিসাব। স্থানীয়দের কথোপকথনে কেউ বিএনপির ধানের শীষের সম্ভাবনার কথা বলছেন, আবার কেউ জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার ভোট বাড়ার হিসাব করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা হরেক চন্দ্রের বক্তব্যে উঠে আসে সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতি দুই দলের বিশেষ আগ্রহের বিষয়টি। তাঁর ভাষ্য, প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন এবং এ কারণে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি ছিল। বিগত ১১টি সংসদ নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি একবার এ আসনে জয় পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আসনটির ভোটের পুরোনো সমীকরণও বদলে গেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন থেকে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এবার আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের দাবি, এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। সংখ্যার দিক থেকে এই ভোট কোনো প্রার্থীর জন্যই উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশেষ করে যেসব কেন্দ্রে হিন্দু ভোটারদের আধিক্য রয়েছে, সেসব কেন্দ্রে আগের নির্বাচনের ফলাফলও এবারের প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের একটি ভোটকেন্দ্রের হিসাব এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ১৪৯ জন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির অধিকাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এখানে ধানের শীষ পেয়েছিল ১ হাজার ৮৭৬ ভোট। বিপরীতে দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৫০৯ ভোট।

দক্ষিণ বঠিনা ও বাগপুর এলাকার ভোটারদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়। এই কেন্দ্রে ভোটার ৩ হাজার ৭৫৯ জন। স্থানীয়দের হিসাবে, কেন্দ্রটির প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। আগের নির্বাচনে এখানে ধানের শীষ পেয়েছিল ২ হাজার ১৯৬ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৪৭৬ ভোট। অর্থাৎ এই কেন্দ্রগুলোর ফলাফলে বিএনপি যে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, সেটি এবারও ধরে রাখার চেষ্টা করছে দলটি।

উত্তর ঠাকুরগাঁও এলাকার রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। সেখানে মোট ভোটার ২ হাজার ৩০ জন। আগের নির্বাচনে ধানের শীষ পেয়েছিল ১ হাজার ৩৫৩ ভোট। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী পেয়েছিলেন ২২৯ ভোট। ফলে হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে বিএনপির আগের অবস্থান ধরে রাখা এবং জামায়াতের ভোট বাড়ানোর চেষ্টা এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতা বুঝতে পেরে দুই দলের প্রার্থীরাই সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও স্থানীয় সামাজিক পরিবেশের কথা তুলে ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কালীবাড়ি এলাকার মন্দিরের আশপাশে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

মির্জা ফয়সল আমীনের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে পারস্পরিক সহাবস্থানের প্রসঙ্গ। তিনি বলেছেন, তাঁর বাড়ির জবা ফুল দিয়ে যেমন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পূজা হয়, তেমনি তাঁদের বাড়ির তুলসীগাছের পাতা দিয়ে মুসলিম পরিবারের অসুস্থ মানুষের উপকার হয়—এমন সামাজিক পরিবেশেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর দাবি, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষতি হতে দেবেন না।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনও সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, সে সময় তাঁরা আক্রান্ত মানুষের পাশে ছিলেন। নির্বাচিত হলে ওই সময় সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

দুই প্রার্থীর বক্তব্যেই তাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, অধিকার এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর পেছনে নির্বাচনী বাস্তবতাও রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, যে ভোটব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত ছিল, সেই ভোট এবার বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে। ফলে সামান্য ভোটের পরিবর্তনও কোনো কোনো কেন্দ্রে ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত বলেন, নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর মতে, ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোটের পরেও যেন কোনো সংখ্যালঘু পরিবার ভয়ভীতি, হয়রানি বা হামলার শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

এই উদ্বেগের বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নির্বাচনের পরিবেশ নিয়েও ভোটারদের প্রত্যাশা রয়েছে। ভোটাররা চান, তাঁরা যেন কোনো ধরনের চাপ ছাড়াই পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভোটাররা যাতে ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের পরও এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ধানের শীষ প্রতীকে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন লড়ছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম হাতপাখা প্রতীকে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী বটগাছ প্রতীকে এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক ডাব প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তবে মাঠপর্যায়ের আলোচনা ও প্রচারণার ধরন দেখে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন অনেক ভোটার। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংখ্যালঘু ভোট কতটা ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিএনপি চাইছে হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে আগের নির্বাচনের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে। অন্যদিকে জামায়াত এসব কেন্দ্রে নিজেদের ভোটের পরিমাণ বাড়িয়ে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে।

শেষ পর্যন্ত সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যায়, তা শুধু প্রার্থীদের প্রচারণা বা রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না; ভোটারদের নিরাপত্তা, স্থানীয় সম্পর্ক, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা, জাতীয় রাজনীতির প্রভাব এবং সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় পরিচয় যেন কোনো ভোটারের ওপর চাপ বা ভয় তৈরির কারণ না হয় এবং প্রত্যেক নাগরিক যেন স্বাধীনভাবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

ঠাকুরগাঁও-১-এর নির্বাচনী মাঠে এখন তাই প্রতিটি ভোটই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সংখ্যালঘু ভোটারকে ঘিরে যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, ২৯ অক্টোবরের ভোটে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ফলাফল যেদিকেই যাক, এই উপনির্বাচন ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সংখ্যালঘু ভোটের নতুন প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com