দাফনে বাধার অভিযোগে জামায়াতকে প্রশ্ন তাসনিম জারার

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার
দাফনে বাধার অভিযোগে জামায়াতকে প্রশ্ন তাসনিম জারার
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির দাফন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে মানবিক মর্যাদা, ধর্মীয় অনুভূতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা প্রশ্ন তুলেছেন, বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানে থেকেও যদি কেউ একজন মৃত মানুষের দাফন নিয়ে বাধা সৃষ্টি করেন, তাহলে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেলে তাঁদের আচরণ কেমন হতে পারে।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তাসনিম জারা ঘটনাটিকে শুধু একজন ব্যক্তির দাফনসংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে দেখেননি; বরং এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং মানুষের মৌলিক মর্যাদার প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বিষয়—কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি কিংবা অতীত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহের প্রতি সম্মান এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা উচিত।

তাসনিম জারার বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টার দিকে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর সাধারণত গ্রামবাংলায় যে স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতার দৃশ্য দেখা যায়, এই ঘটনায় তার বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষায়, কোনো মানুষ মারা গেলে গ্রামের লোকজন নিজেরাই কবর খোঁড়ার কাজে এগিয়ে আসেন। কেউ কোদাল নিয়ে আসেন, কেউ বাঁশ কাটেন, কেউ আবার দাফনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়ানোকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে বলে তাসনিম জারা দাবি করেন।

তাঁর পোস্টে বলা হয়, স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে প্রচার চালান। এ নিয়ে মিছিল করার পাশাপাশি মাইক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রিয়জনের দাফন সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পরপরই যেখানে পরিবারের পাশে স্বজন ও প্রতিবেশীদের থাকার কথা, সেখানে তাঁদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় কাটাতে হয়েছে বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

তাসনিম জারার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে মানিক পশারীর বাড়িতে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কিছু লোক এসে সেই কবর ভরাট করে দেন। পরে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় কবর খোঁড়ার কাজে অন্য কাউকে পাওয়া যায়নি বলে তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের নারী সদস্যদেরই কোদাল হাতে কবর খুঁড়তে হয়। মৃত ব্যক্তির মেয়ে ও বোনেরা নিজের হাতে কবর খুঁড়েছেন—ঘটনার এই বিবরণটি সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

তাঁর বর্ণনা অনুসারে, শেষ পর্যন্ত মাঝরাতের পর পুলিশি পাহারায় মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। কবর খোঁড়ার কাজ থেকে শুরু করে দাফন সম্পন্ন করা পর্যন্ত তাঁর পরিবারের সদস্যদের যে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা। তাঁর দাবি, প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক পক্ষ এবং পরিবারের বক্তব্যসহ সব পক্ষের তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

মানিক পশারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটভুক্ত ছিলেন বলে তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর একজন সহকারী সেক্রেটারি মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে মন্তব্য করেছিলেন। ওই নেতার বক্তব্য হিসেবে তিনি আরও উল্লেখ করেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ওই একই নেতা জামায়াতের নেতারা ‘লাশের রাজনীতি’ করেন না বলে মন্তব্য করেছেন বলেও তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে দাবি করেন।

এখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক এবং একজন মৃত মানুষের দাফনের অধিকার—দুটি পৃথক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা যাচাই করার জন্য রাষ্ট্রীয় নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা তাঁর পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ন্যায়সংগত কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়। তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে এই পার্থক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মানিক পশারীর স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়—দাফন আটকে দিয়ে বা জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়ে নয়।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে মৃত্যু ও দাফনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি রয়েছে। জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে কারও কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রচলনও বহু এলাকায় দেখা যায়। সাধারণত মৃত ব্যক্তির ছেলে, ভাই কিংবা অন্য স্বজন উপস্থিত মানুষের কাছে অনুরোধ করেন, জীবদ্দশায় তাঁর আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এই রীতির মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের সমাপ্তি, ক্ষমাশীলতা এবং শোক ভাগ করে নেওয়ার একটি মানবিক দিক রয়েছে। তাসনিম জারা তাঁর পোস্টে সেই ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে বলেন, মানিক পশারীর পরিবার নিজের গ্রামে জানাজা ও মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

দাফন নিয়ে বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কবরস্থানের অধিকার। তাসনিম জারা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত হবেন কি না, তা নির্ধারণ করার অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের রয়েছে কি না। তাঁর বক্তব্যে এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কোনো এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাফন সম্পন্ন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ওপর বর্তায়। একই সঙ্গে কোনো বিরোধ থাকলে তা আইনসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তি করা জরুরি।

পোস্টে তাসনিম জারা জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণের মধ্যেও অসংগতি দেখার কথা বলেছেন। তাঁর অভিযোগ, দলটি নিজেদের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং মানবিক মর্যাদার কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করছে না। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলটির অতীত ভূমিকা এবং বর্তমান অবস্থানের মধ্যে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং কারও দাফন কোথায় হবে, তা রাজনৈতিক কর্মীদের নির্ধারণ করার চেষ্টাকে তিনি বিশেষভাবে সমালোচনা করেছেন।

তবে এই অভিযোগ ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের পাশাপাশি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ। মানিক পশারীকে দাফন করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, কবর ভরাট করার দাবি, সংশ্লিষ্ট নেতার বক্তব্য এবং প্রশাসনের ভূমিকা—প্রতিটি বিষয়ই নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিরোধ যত তীব্রই হোক, কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রমাণ, নথি এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। একইভাবে অভিযোগের মুখে থাকা পক্ষের বক্তব্যও জনসমক্ষে আসা জরুরি, যাতে ঘটনাটি নিয়ে একপাক্ষিক ধারণা তৈরি না হয়।

মানিক পশারীর মৃত্যুর পর ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাসনিম জারার প্রশ্ন তাই শুধু জামায়াতে ইসলামীর প্রতি রাজনৈতিক সমালোচনা নয়; এটি ক্ষমতা, সহনশীলতা এবং নাগরিক মর্যাদা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলগুলোর মতাদর্শ ও ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কারও রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি যেন শোকাহত পরিবারকে হয়রানি, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা মৃত ব্যক্তির দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণ না হয়, সেটিই এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক শিক্ষা।

তাসনিম জারা তাঁর পোস্টের শেষাংশে প্রশ্ন করেছেন, বিরোধী দলে থাকতেই যদি কেউ নিজের বসতভিটায় একজন মৃত মানুষকে দাফন করতে বাধা দেন, তাহলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তাঁদের হাতে গেলে কী ঘটতে পারে। প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ হলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্বেগ হলো—ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মানদণ্ড সবার জন্য সমান থাকবে কি না। রাজনৈতিক দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কিংবা বক্তৃতায় দেওয়া বক্তব্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; সংকটের মুহূর্তে তারা ভিন্নমতাবলম্বী, দুর্বল মানুষ এবং শোকাহত পরিবারের সঙ্গে কী আচরণ করে, তার মধ্য দিয়েও সেই বিশ্বাসযোগ্যতা প্রকাশ পায়।

একজন প্রবীণ মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে যদি দাফনের মতো মৌলিক ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে বাধার মুখে পড়তে হয়, তবে তা সংশ্লিষ্ট এলাকার সামাজিক পরিবেশ এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলে। এই ঘটনার সুষ্ঠু অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, মৃত্যু ও শোকের মুহূর্তে মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা এবং আইনের শাসন বজায় রাখা একটি সভ্য সমাজের মৌলিক দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com