রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ‘সুনির্দিষ্ট’ হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। একই সঙ্গে সৌদি আরবের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশন লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার প্রকৃত প্রভাব, ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের বিষয়ে হুতিদের দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানান, তাঁদের বাহিনী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। হামলাটিকে ‘সুনির্দিষ্ট’ বলে বর্ণনা করলেও বিবৃতিতে ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন, আঘাতের সুনির্দিষ্ট স্থান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষও বিমানবন্দরে সরাসরি হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য দেয়নি।

এ ঘটনার আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছিল, ইয়েমেনের রাজধানী সানার দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের বক্তব্য অনুযায়ী, এর মধ্যে একটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে রিয়াদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, যা সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শনাক্ত করে প্রতিহত করেছে। সৌদি পক্ষের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হুতিদের নতুন হামলার দাবি সামনে আসে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে সংঘাতের সামরিক পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হুতিদের মুখপাত্র আরও দাবি করেছেন, সৌদি আরবের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে কোন কোন স্থাপনায় হামলা হয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে কি না কিংবা তেল পরিবহনে কোনো বিঘ্ন ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ ছাড়া এসব স্থাপনায় হামলার মাত্রা ও সম্ভাব্য প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।

বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই পাল্টাপাল্টি দাবি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি এবং জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে হুতিরা। এর বিপরীতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। দুই পক্ষের এই ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

এর আগের দিন রোববারও রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইতে অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং জিজানের একটি নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছিল হুতিরা। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়। তবে সব হামলার দাবি সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কোন স্থাপনায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন।

হুতিদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫৬টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হোদেইদাহ, লাহজ, আমরান, সাহদা, আল-জওফ, তাইজ ও ইব প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে এসব হামলা হয়েছে। তবে হামলার সংখ্যা, লক্ষ্যবস্তু এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত। সংঘাতের দুই পক্ষের দেওয়া বক্তব্যে সামরিক সাফল্য তুলে ধরার প্রবণতা থাকায় নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আনুষ্ঠানিক বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে শনিবারও সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে সাতটি হামলা চালানোর দাবি করেছিল হুতিরা। এসব দাবির মধ্য দিয়ে সংগঠনটি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখার বার্তা দিচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। তবে কোনো হামলার সামরিক উদ্দেশ্য বা সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট স্থানের ক্ষয়ক্ষতি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

সৌদি আরবের অভিযোগ, হুতিরা পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা। পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একই সঙ্গে দেশটির বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচলকেন্দ্র। আন্তর্জাতিক যাত্রী, প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যাতায়াতের পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও বিমানবন্দরটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ফ্লাইট চলাচল, যাত্রীদের যাত্রাসূচি এবং বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা থাকলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা জোরদার, আকাশপথ পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়।

জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সৌদি আরব বিশ্ববাজারে অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ। অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশনগুলো সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে তেল পরিবহনের সময়সূচি এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সরবরাহসংক্রান্ত আশঙ্কার প্রতি সংবেদনশীল। তবে বর্তমান ঘটনায় বাস্তবিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে বা বাজারে নির্দিষ্ট প্রভাব পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই।

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতও এই উত্তেজনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির গৃহযুদ্ধে হুতিরা রাজধানী সানাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রভাব ধরে রেখেছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব দিয়েছে। এই বিরোধের ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। সংঘাতের প্রতিটি নতুন পর্যায় ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামলার দাবি এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা ঘটনার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা। হুতিদের পক্ষ থেকে বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করা হলেও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত নয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস এবং রিয়াদের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য, বিমানবন্দর পরিচালনার অবস্থা এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির প্রকৃত মাত্রা আরও পরিষ্কার হতে পারে।

এদিকে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বেসামরিক বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা সাধারণ মানুষের জীবন, আন্তর্জাতিক যাতায়াত এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম, বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাত কমাতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রিয়াদের বিমানবন্দর ও সৌদি জ্বালানি স্থাপনাকে ঘিরে সর্বশেষ দাবির সত্যতা, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এবং পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের ওপর এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com