গাজীপুরের টঙ্গীতে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। সোমবার সকালে উত্তর আউচপাড়া খাঁ-পাড়া এলাকার লাকী স্টার অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকেরা কারখানার সামনে জড়ো হয়ে দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা আউচপাড়া-তিলারগাতী আঞ্চলিক সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেন। এরপর শ্রমিকেরা কারখানার মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে তাঁদের দাবির কথা জানান।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানাটিতে প্রায় ৯৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের গত সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। এর মধ্যে কর্তৃপক্ষ গত ১৩ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বেতন না পেয়ে সংসারের নিয়মিত খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, বকেয়া পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি কারখানাটি দ্রুত খুলে দিয়ে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
সোমবার সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকেরা কারখানায় এসে বেতন পরিশোধের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, অনিশ্চিত কর্মপরিস্থিতি এবং পরিবারের খরচ মেটানোর চাপ তাঁদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছে বলে শ্রমিকদের বক্তব্য। কারখানার ভেতরে কাজ বন্ধ থাকায় তাঁরা কখন কাজে ফিরতে পারবেন, সেটি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন না পাওয়ার কারণে অনেকেই বাড়িভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা এবং দোকানের বাকি পরিশোধ করতে পারছেন না।
আন্দোলনের একপর্যায়ে শ্রমিকেরা খাঁ-পাড়া-তিলারগাতী আঞ্চলিক সড়কে অবস্থান নেন। এতে সড়কটিতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয়ভাবে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানা-পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁরা শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে শ্রমিকেরা কারখানার মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। তাঁদের মূল দাবি ছিল বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ এবং কারখানার কার্যক্রম পুনরায় চালু করা।
কারখানার কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁরা সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতা পাননি। তাঁদের একজনের বক্তব্য, বেতন না থাকায় ঘরভাড়া দেওয়া এবং দোকানে জমে থাকা বাকি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে তাঁরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। নিয়মিত কাজের বিনিময়ে প্রাপ্য অর্থ সময়মতো না পেলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো যে কতটা কঠিন হয়ে পড়ে, শ্রমিকদের বক্তব্যে সেই বাস্তবতা উঠে এসেছে।
পোশাকশ্রমিকদের আয় সাধারণত তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি। মাসের নির্ধারিত সময়ে বেতন হাতে না এলে বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং যাতায়াতের খরচ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শ্রমিকের হাতে জরুরি পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকায় এক মাসের বেতন আটকে যাওয়াও তাঁদের জীবনে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কারখানা বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতে কাজ ও আয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে।
লাকী স্টার অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কারখানার অ্যাডমিন ম্যানেজার মো. ফজলে আজিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে বেতন-ভাতা পরিশোধে বিলম্বের কারণ, সাধারণ ছুটি ঘোষণার প্রেক্ষাপট এবং কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানা যায়নি। শ্রমিকদের দাবির পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান জানান, শ্রমিকদের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ না করেই কর্তৃপক্ষ কারখানাটি বন্ধ রেখেছে। বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে শ্রমিকেরা সোমবার সকালে কারখানার সামনে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। তবে বকেয়া পাওনা কবে পরিশোধ করা হবে কিংবা কারখানার কার্যক্রম কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সময়সূচি পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টি শুধু একটি কারখানার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর সঙ্গে তাঁদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত। শ্রমিকেরা নিয়মিত বেতন পেলে তাঁদের আয় থেকে বাজার, বাড়িভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু বেতন আটকে গেলে পরিবারের খরচের পাশাপাশি স্থানীয় দোকানপাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাওনা আদায়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ কারণে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও শ্রমিকদের বকেয়া পাওনার বিষয়টি অনিষ্পন্ন থাকলে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণার মধ্যে তাঁরা বেতন না পাওয়ার কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ছুটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কারখানা চালু হবে কি না, কিংবা বকেয়া বেতন পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বক্তব্য ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা কমতে পারে।
শ্রমিকদের দাবি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বকেয়া বেতনের হিসাব নির্ধারণ, পাওনা পরিশোধের সময়সূচি জানানো এবং কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে দাবি-দাওয়া নিয়ে বিরোধ আরও বিস্তৃত না হয় এবং কর্মপরিবেশ স্বাভাবিক করার পথ তৈরি হয়।
সোমবারের বিক্ষোভের পর শ্রমিকেরা কারখানার মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং কারখানা খুলে দেওয়ার দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৯৫০ শ্রমিকের কর্মজীবন ও তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে বিষয়টি জড়িত থাকায় দ্রুত ও কার্যকর সমাধান প্রত্যাশা করছেন আন্দোলনকারীরা। বেতন পরিশোধ এবং উৎপাদন কার্যক্রম চালুর বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি না হলে শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত