প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করে সিলেট জেলা প্রশাসনের এলআর ফান্ডের আয়-ব্যয়ের হিসাবসহ বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না দেওয়ার পর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা হয়। আপিলের শুনানি শেষে বিভাগীয় কমিশনার জানান, চাওয়া তথ্য দিতে আইনগত কোনো বাধা নেই এবং আবেদনটি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। তবে সেই নির্দেশের ৩৮ দিন পর জেলা প্রশাসন জানায়, ‘এলআর ফান্ড’ নামে কোনো তহবিল বা হিসাব তাদের কার্যালয়ে নেই। ফলে চাওয়া তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
একই বিষয়ে দুই পর্যায়ে দুই ধরনের বক্তব্য দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রথমে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় না পড়ার কথা জানিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি এবং পরে সংশ্লিষ্ট তহবিল বা হিসাবই নেই বলে দাবি করার মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসনের আর্থিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের তহবিলের আয়-ব্যয়ের তথ্য জনগণের জানার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এলআর ফান্ড নিয়ে প্রশ্নটি সামনে আসে গত জুন মাসে সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা দানের একটি ঘটনার পর। ওই অর্থ কোন তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে তা সংগ্রহ করা হয় এবং এ ধরনের অর্থ ব্যয়ের বিধি কী—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় সিলেট জেলা প্রশাসনের কাছে এলআর ফান্ড-সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়।
গত ২৫ জুন দেওয়া ওই আবেদনে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত সময়ের বিভিন্ন তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল জেলা প্রশাসনের এলআর ফান্ডে মোট কত টাকা জমা হয়েছে, ওই সময়ে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কারা অর্থ দিয়েছেন এবং তাঁদের পরিচয় কী, কোন কোন খাতে অর্থ ব্যয় হয়েছে, অতিথি আপ্যায়নে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং সিলেট সার্কিট হাউসের অবকাঠামো উন্নয়ন বা আসবাবপত্র কেনার কাজে এই তহবিল থেকে কোনো অর্থ ব্যয় করা হয়েছে কি না।
আবেদনে আরও জানতে চাওয়া হয়েছিল, সার্কিট হাউসের উন্নয়ন বা আসবাব কেনায় অর্থ ব্যয় হয়ে থাকলে তার পরিমাণ কত এবং কোন খাতে তা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মোট আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, তহবিলে অর্থের উৎস এবং ব্যয়ের খাত সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ১৫ জুলাই জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তথ্য-অভিযোগ শাখার সহকারী কমিশনার লাবন্য ইসলাম লিখিত জবাবে জানান, এলআর ফান্ড ‘স্থানীয় তহবিল’ হওয়ায় এ-সংক্রান্ত তথ্য তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে আবেদনকারীর চাওয়া তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়।
জেলা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০ জুলাই সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমানের কাছে আপিল করা হয়। ৩০ জুলাই এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে বিভাগীয় কমিশনার তাঁর লিখিত আদেশে বলেন, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এ তথ্যের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং আইনের ৭ ধারায় যেসব তথ্য প্রকাশ বা প্রদান বাধ্যতামূলক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে এলআর ফান্ড-সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই আবেদনকারীর চাওয়া তথ্য দিতে আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় কমিশনার জেলা প্রশাসককে আবেদনটি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। আদেশের অনুলিপি আবেদনকারীকে ১২ আগস্ট ই-মেইলে এবং ১৮ আগস্ট ডাকযোগে দেওয়া হয়।
কিন্তু এরপরও চাওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশের ৩৮ দিন পর, ৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লাবন্য ইসলাম ই-মেইলে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, আবেদনে উল্লেখ করা ‘এলআর ফান্ড’ নামে কোনো তহবিল কিংবা হিসাব জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে নেই। এ কারণে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয় বলেও চিঠিতে জানানো হয়। পরে একই চিঠি ডাকযোগেও পাঠানো হয়।
জেলা প্রশাসনের ওই চিঠিতে অবশ্য বলা হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপন, প্রটোকল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তা ব্যয় করা হয়। কিন্তু এ ধরনের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব আবেদনকারীকে দেওয়া হয়নি।
ফলে বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে তথ্য দিতে আইনগত বাধা নেই বলে স্পষ্ট করা হলেও চাওয়া ছয় ধরনের তথ্যের কোনোটিই সরবরাহ করা হয়নি। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের দুটি জবাবকে ঘিরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন উঠেছে।
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী বিষয়টিকে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রথমে বলা হয়েছে তথ্য অধিকার আইনের আওতাভুক্ত নয়, আবার আপিলের পর বলা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট তহবিল বা হিসাবই নেই। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাঁর ভাষ্য, এলআর ফান্ড নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা প্রচলিত থাকলেও তথ্য না পাওয়ায় সেসব অভিযোগের বিষয়ে মানুষের সন্দেহ আরও বাড়তে পারে।
তিনি মনে করেন, তহবিলের আয়-ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করা হলে এ নিয়ে অযাচিত সন্দেহের অবকাশ কমবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থাও বাড়বে। কারণ, কোনো তহবিলের অর্থ কোথা থেকে আসে এবং কোথায় ব্যয় হয়—এটি জানার সুযোগ থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সচেতন নাগরিক কমিটি সিলেটের সভাপতি ও প্রবীণ আইনজীবী সৈয়দা শিরিন আক্তারও তথ্য প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এলআর ফান্ডের তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় এ ধরনের তথ্য জনগণকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তথ্য দিতে গড়িমসি বা একাধিক ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হলে তাতে অনিয়মের সন্দেহ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এলআর ফান্ডের অর্থের উৎস ও পরিমাণ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সিলেট জেলা প্রশাসনের সাবেক দুই পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সিলেটে এ ধরনের তহবিলে বছরে আনুমানিক ২ থেকে ৩ কোটি টাকা জমা হতে পারে। পাথর কোয়ারি চালু থাকার সময়ে অর্থের পরিমাণ আরও বেশি ছিল বলেও তাঁদের দাবি। তবে বছরভেদে এই অর্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
সাবেক ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তহবিলের হিসাব জেলা প্রশাসনের নেজারত শাখায় সংরক্ষিত থাকার কথা এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার অভ্যন্তরীণভাবে এসব হিসাব নিরীক্ষা করেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ী, প্রবাসী, লাইসেন্সধারী অস্ত্রের মালিক, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান বা চাঁদা হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
তবে জেলা প্রশাসনের বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে এসব দাবির একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কারণ, জেলা প্রশাসন বলছে, ‘এলআর ফান্ড’ নামে কোনো তহবিল বা হিসাব তাদের কার্যালয়ে নেই। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বহুদিন ধরে ব্যবহৃত একটি প্রশাসনিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সরকারি দপ্তরের নথিপত্রের সম্পর্ক কী, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
তথ্য অধিকার আইনে কোনো তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর সাধারণভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে বা নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পাওয়া গেলে আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে পারেন। সেখান থেকেও প্রতিকার না মিললে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।
তথ্য কমিশনের কার্যক্রমও সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থবির ছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারদের পদত্যাগের পর কমিশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। পরে ১৭ অক্টোবর প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নাহরিন ইসলাম খান এবং কমিশনার হিসেবে এস এ এম মাহফুজুর রহমান ও খান মোহাম্মদ আবুল হোসেন নিয়োগ পান।
সিলেট জেলা প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আবেদনকারীকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এর বাইরে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
সব মিলিয়ে এলআর ফান্ডের তথ্য চাওয়ার ঘটনাটি এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট তহবিলের হিসাব জানার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি দপ্তরের তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের বিষয়। একটি তহবিল থাকলে তার আয়-ব্যয়ের হিসাব কোথায় সংরক্ষিত হয়, কারা তা পরিচালনা করেন এবং কোন বিধির অধীনে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করা হয়—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন।
কারণ সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো আস্থা। আর সেই আস্থা টেকসই করতে হলে অর্থের উৎস ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সিলেটের এলআর ফান্ড নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোরও শেষ পর্যন্ত নিরসন হতে পারে প্রয়োজনীয় নথি প্রকাশ, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর জবাবদিহির মধ্য দিয়েই।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত