তারেক রহমানের জন্যই সংবিধান সংস্কার চান নাহিদ ইসলাম

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
তারেক রহমানের জন্যই সংবিধান সংস্কার চান নাহিদ ইসলাম

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সরকারের বৈধতা যেন পরবর্তী সময়ে প্রশ্নের মুখে না পড়ে, সে জন্যই এখন সংবিধান সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর মতে, অতীতের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি হলে বর্তমান সরকারও ভবিষ্যতে একই ধরনের সাংবিধানিক সংকটে পড়তে পারে।

রোববার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় এনসিপির প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। দলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে ৩০ অক্টোবর শাহবাগে অনুষ্ঠেয় গণবিক্ষোভের প্রচার চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের অভিযোগের প্রতিবাদে ওই কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সংবিধান সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো। তিনি বর্তমান সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সংসদে যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বেশি থাকে, তাহলে সেই কাঠামোর মাধ্যমে গৃহীত সংশোধনী ভবিষ্যতে কতটা টেকসই হবে, সেটি বিবেচনা করা জরুরি। তাঁর আশঙ্কা, আজ যে সংশোধনীকে ভালো বা প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, ভবিষ্যতের কোনো সরকার সেটিকে বাতিল করে বর্তমান সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের পুরোনো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে নতুন একটি গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নাহিদ ইসলাম মনে করেন, শুধু রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না; এর সঙ্গে সাংবিধানিক কাঠামোর সংস্কারও জরুরি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, তারেক রহমানের ভালোর জন্যই তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলছেন। তাঁর যুক্তি, বর্তমান সরকার যদি অতীতের বিতর্কিত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই বর্তমান সময়েই এমন একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা দরকার, যা পরবর্তী সরকারগুলোর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে থাকবে।

বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রসঙ্গও টানেন। তাঁর মতে, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে আওয়ামী লীগ যেভাবে ‘অবৈধ ক্ষমতা দখলদার’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে, ভবিষ্যতে একই ধরনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হতে পারে। তবে তাঁর এই বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর দলের অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ পায়। তাঁর দাবি, সমতল থেকে পাহাড়—দেশের বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সরকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পাহাড়কে শান্ত ও স্থিতিশীল রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সেখানে অস্থিরতার কারণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাহাড়ে কারা অস্ত্র সরবরাহ করছে, কারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে এবং কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। একই সঙ্গে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তবে পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের একটি অংশ ছিল প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে ‘গোপন আঁতাতের’ অভিযোগ করেন এবং দাবি করেন, এর ফলেই পাহাড়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলেও তাঁর বক্তব্যে তিনি এর পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে উপস্থাপন করেননি। ফলে বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে এবং এর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধান, নির্বাচন এবং সংসদের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট সংসদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার এই তিনটি সংসদকে অবৈধ ঘোষণার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, রাজনৈতিকভাবে কোনো সংসদকে অবৈধ বলার দাবি থাকলেও সেটিকে আইনগতভাবে কার্যকর করার বিষয়টি ভিন্ন।

তিনি বলেন, বিএনপিও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ওই তিনটি সংসদকে অবৈধ বলে মনে করে এবং এনসিপিও একই অবস্থান পোষণ করে। তবে আইনগতভাবে সেগুলোকে অবৈধ ঘোষণার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কারণ বর্তমান বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ওই সংসদগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করেনি। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্যটিও সামনে এসেছে।

সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি রাষ্ট্রের মৌলিক আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর স্থায়িত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাই উঠে এসেছে।

এনসিপির পক্ষ থেকে আয়োজিত প্রচার কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল ৩০ অক্টোবর শাহবাগের গণবিক্ষোভে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। দলটি বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন। প্রচারপত্র বিতরণের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এই কর্মসূচির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে দলটি।

মিরপুরের কর্মসূচিতে নাহিদ ইসলামের পাশাপাশি এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, মনিরা শারমিন, সালেহউদ্দিন সিফাত ও নুসরাত তাবাসসুমসহ দলটির অন্য নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কারের দাবি শুধু একটি দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ঘিরে সামনে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কতটা ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দেশের জনগণের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখন অন্যতম বড় প্রত্যাশার বিষয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। তাই সংবিধান সংস্কারের যে দাবি সামনে এসেছে, তার বাস্তবায়ন হলে সেটি কতটা অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী হয়—তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংলাপ, ঐকমত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ককেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com