টোকিও পৌঁছে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় জোর প্রধানমন্ত্রীর

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
টোকিও পৌঁছে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় জোর প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বাড়ানোই এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি নিয়মিত ফ্লাইট টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তখন বাংলাদেশ সময় ছিল সকাল ৬টা ৫ মিনিট। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা। এ সময় টোকিওতে বাংলাদেশের দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে সীমিতসংখ্যক সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়। চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা রয়েছেন।

সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তারেক রহমানের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথ ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। পরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজনে মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তারেক রহমান ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাপান সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিস্তৃত সম্ভাবনার কারণে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। অবকাঠামো, পরিবহন, নগর উন্নয়ন, জ্বালানি, মানবসম্পদ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন বাস্তবতায় সেই সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগনির্ভর অংশীদারত্বে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে দুই দেশের।

সফরকালে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। জাপানের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ, শিল্পায়নের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।

এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বাস্তবায়ন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে। পাশাপাশি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

জাপানের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, শিল্পকারখানা স্থাপন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। জাপানের বেসরকারি খাতকে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে দুই দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। এই ফোরামকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পায়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে এ আয়োজন ভূমিকা রাখতে পারে।

জাপানের বিভিন্ন শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনাও সফরসূচির অংশ। এর মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আধুনিক শিল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও শিল্পায়নের প্রেক্ষাপটে এসব খাতে জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সফরে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা, কৃষি, বেসামরিক বিমান চলাচল, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন, জ্বালানি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিভিন্ন খাতে এসব সমঝোতা হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিও দুই সরকারপ্রধানের আলোচনায় স্থান পেতে পারে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সহযোগিতার মতো বিষয় নিয়ে মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হওয়ায় এ বিষয়ে দেশটির ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতার উপস্থিতি রয়েছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এবারের সফরে সেই সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। বিশেষ করে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে জাপানি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

চার দিনের সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তবে সফরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক ফলাফলও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। বৈঠক, বিনিয়োগ আলোচনা, সম্ভাব্য সমঝোতা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ থেকে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ তৈরি হলে ঢাকা-টোকিও সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই সফর তাই কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন দরজা খোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com