প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ তিন দফা দাবিতে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ পঞ্চম দিনেও অব্যাহত রয়েছে। গত ২২ অক্টোবর থেকে চলা এই কর্মসূচির কারণে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সাজেকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটিই বর্তমান কর্মসূচির অন্যতম পটভূমি বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। অবরোধের পঞ্চম দিন সোমবারও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমানভাবে পিকেটারদের অবস্থান দেখা যায়নি বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা জানিয়েছেন, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে অপসারণ, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবিতে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
সাজেকের মতো পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে সড়ক যোগাযোগই মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অবরোধের কারণে সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতে। পাহাড়, মেঘ, সবুজ প্রকৃতি ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশের কারণে সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণগন্তব্য। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সেখানে ছুটে যান। পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং বিভিন্ন ছোট-বড় ব্যবসা। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে গত ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে যারা আগে থেকেই সাজেক ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের অনেককেই ভ্রমণ বাতিল বা স্থগিত করতে হয়েছে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদেরও নিরাপদে ফিরে আসার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয়দের জন্য এ পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাজেকে পর্যটন মৌসুমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর অনেক পরিবার ও কর্মজীবী মানুষের আয় নির্ভর করে। কয়েক দিন পর্যটক না থাকলেও এর প্রভাব ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে আবাসন ও পরিবহন খাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের একটি অংশের কাছে নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পর্যটন ব্যবসায়ীদের কাছে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসাও জরুরি। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধান খোঁজার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ দূর হয় এবং পর্যটনকেন্দ্রটির কার্যক্রমও নিরাপদ পরিবেশে পুনরায় চালু করা যায়।
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পাহাড়ি এলাকার মানুষের নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটননির্ভর অর্থনীতির বিষয়গুলোও জড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নানা ধরনের প্রভাব পড়েছে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি যেকোনো সংকট শান্তিপূর্ণ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দোলনকারীদের তিন দফা দাবির প্রথমটি হলো সাজেক এলাকা থেকে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয় দাবিতে স্থানীয় পাহাড়ি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আর তৃতীয় দাবিতে এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব দাবির বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সমস্যা সমাধানে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানা গেছে।
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা দ্রুত একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের। কারণ অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতির ওপর তত বেশি চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান খোঁজা জরুরি হয়ে উঠেছে।
সাজেকের পাহাড়ি সৌন্দর্য প্রতিবছর হাজারো মানুষকে আকর্ষণ করে। পর্যটকদের কাছে এটি যেমন প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ, তেমনি স্থানীয় মানুষের কাছে পর্যটন তাদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়তে পারে।
এ কারণে নিরাপত্তা ও অধিকারসংক্রান্ত দাবিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল, স্থানীয় অর্থনীতি এবং পর্যটন খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান হলে সাজেকের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে এবং পর্যটনকেন্দ্রটিও নিরাপদ পরিবেশে পুনরায় চালু করার পথ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত