প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় বাড়লেও সেই খাবার কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বাজারের চাল, মাছ, দুধ, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে রাস্তার খাবার কিংবা রেস্তোরাঁর পরিবেশিত সালাদ—বিভিন্ন গবেষণা ও পরীক্ষায় ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু, মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতির তথ্য সামনে এসেছে। ফলে শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত খাবার থাকাই এখন আর যথেষ্ট নয়; সেই খাবার উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরিবেশনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিরাপদ খাবারের প্রভাব কখনো তাৎক্ষণিক, আবার কখনো দীর্ঘমেয়াদি। দূষিত খাবার খেয়ে ডায়রিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া কিংবা বিভিন্ন সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর সংস্পর্শে থাকলে কিডনি, স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু দূষকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও উদ্বেগের।
বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে বছরে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। কিছু হিসাবে বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪২ হাজার মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে অনিরাপদ খাদ্যকে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এসব সংখ্যা বিভিন্ন উৎস, গবেষণাপদ্ধতি ও অনুমানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এগুলোকে দেশের খাদ্যদূষণজনিত মৃত্যুর চূড়ান্ত সরকারি হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবু জনস্বাস্থ্যের ওপর খাদ্যদূষণের সম্ভাব্য বড় প্রভাবের বিষয়টি এসব তথ্যের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দূষিত খাবারে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও রাসায়নিক পদার্থ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এ ধরনের খাদ্যজনিত ঝুঁকিতে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনারেও অনিরাপদ খাদ্যের কারণে ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ফলে নিরাপদ খাদ্য এখন শুধু ভোক্তার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
খাদ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা গবেষণাগারের একটি গবেষণায় পরীক্ষিত ২৩২টি চালের নমুনার মধ্যে ১৩১টিতে ক্রোমিয়াম, ১৩০টিতে ক্যাডমিয়াম ও সিসা এবং ৮৩টিতে আর্সেনিক শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব উপাদান দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির পাশাপাশি অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে পরীক্ষিত নমুনার ফলাফলকে পুরো দেশের সব চালের প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র হিসেবে বিবেচনা করার আগে নমুনা সংগ্রহের স্থান, পদ্ধতি ও পরীক্ষার পরিধি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খাদ্যদূষণের আরেকটি নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার বাজার থেকে সংগৃহীত ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। গবেষণায় খোলা তেলে বোতলজাত তেলের তুলনায় এসব কণার পরিমাণ বেশি পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে।
শুধু তেল বা দুধ নয়, মাছের মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় আড়িয়াল বিলের কয়েকটি প্রজাতির মাছের শরীরে এসব কণা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণের বিভিন্ন পর্যায় থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। তবে মানুষের শরীরে এসব ক্ষুদ্র কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ রয়েছে রাস্তার খাবার ও রেস্তোরাঁয়ও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় রাস্তার খাবার, সালাদ, জুস ও শরবতের বিভিন্ন নমুনায় ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ভিব্রিওর মতো রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। অপরিচ্ছন্ন পানি, খোলা অবস্থায় খাবার রাখা, অপরিষ্কার বাসনপত্র এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি না মানাকে এসব জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফুচকা, চটপটি, ছোলা-মুড়ি, চানাচুর মাখা কিংবা বিভিন্ন ধরনের শরবত দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য রাস্তার খাবার অনেক সময় সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা খাবারের উৎস। ফলে এসব খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু খাদ্যমানের বিষয় থাকে না; এর সঙ্গে নগরজীবন, কর্মজীবী মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তবতাও জড়িয়ে পড়ে। খাবার বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়; বরং খাবার প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
খাদ্যদূষণের সঙ্গে পরিবেশদূষণের সম্পর্কও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল, চট্টগ্রামের আনন্দবাজার এবং সিলেটের মগরা বাজারের ল্যান্ডফিলসংলগ্ন জলাশয় ও কৃষিজমির ফসলে ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সিসা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু শনাক্ত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ইলেকট্রনিক ও ধাতব বর্জ্য থেকে এসব উপাদান মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে দূষিত পানি ও মাটি কৃষি উৎপাদন বা জলজ প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে।
ভারী ধাতুর ঝুঁকি শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অতীতে বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় শিশু ও গর্ভবতী নারীদের শরীরে সিসার উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। সিসার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ শিশুদের স্নায়বিক বিকাশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। তাই নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি শুধু বাজারে ভেজাল পণ্য শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কৃষিজমির নিরাপত্তাও এর অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ঘি, গুড়, মধু, মিষ্টি, হলুদ, মরিচের গুঁড়া, গুঁড়া দুধ ও লবণের মতো পণ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খাবার পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা পর্যায় থেকেই নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন।
তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত জনবল ও তদারকির সীমাবদ্ধতা। বিপুলসংখ্যক হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাজার, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনকারীকে নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা কঠিন। এক জায়গায় অভিযান চালিয়ে অনিয়ম শনাক্ত করার পর যদি নিয়মিত তদারকি না থাকে, তাহলে কিছুদিন পর একই সমস্যা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে।
এই বাস্তবতায় খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। গত ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও ভেজাল শনাক্তে ব্যবহৃত একটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে পরীক্ষাগারের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। বর্তমানে আটটি মহানগরে এ ধরনের পরীক্ষাগারের কার্যক্রম চলছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪ জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত বা বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রি—প্রতিটি পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। খাদ্য পরীক্ষার জন্য আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার বাড়ানো, দক্ষ জনবল নিয়োগ, অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদক, ব্যবসায়ী, পরিবেশক ও ভোক্তার দায়িত্বও রয়েছে। ভোক্তাকে সচেতন হতে হবে, ব্যবসায়ীকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং উৎপাদক পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে নিয়ম তৈরি করার পাশাপাশি সেই নিয়ম বাস্তবে কার্যকর করা।
বাংলাদেশে খাদ্যের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ একটি পরিবার হয়তো প্রতিদিনের খাবার কিনতে পারছে, কিন্তু সেই খাবার যদি অদৃশ্য জীবাণু, ভারী ধাতু, ক্ষতিকর রাসায়নিক কিংবা মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি বহন করে, তাহলে খাদ্যের প্রাপ্যতা মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে না। নিরাপদ খাদ্য তাই এখন শুধু ভোক্তার অধিকার নয়, এটি একটি মৌলিক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়মিত পরীক্ষা, কঠোর তদারকি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সর্বস্তরে সচেতনতার সমন্বয়ই পারে মানুষের খাবারকে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ করে তুলতে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত