আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াই বাংলাদেশেরও: নাহিদ ইসলাম

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াই বাংলাদেশেরও: নাহিদ ইসলাম
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের উচ্ছেদ, নাগরিক অধিকার ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রশ্নকে বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, আসামের বাঙালি মুসলমানদের সংগ্রাম কেবল একটি জনগোষ্ঠীর আবাসন কিংবা নাগরিকত্বের সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাষা, ইতিহাস, পরিচয়, মানবাধিকার এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। আসামের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান ও বাংলাভাষী মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বাংলাদেশের সরকারের কাছে আরও দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব বক্তব্য তুলে ধরেন। পোস্টে তিনি দাবি করেন, আসামের নগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাভাষী মুসলমানদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া এবং তাঁদের নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে বসবাসরত একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে উচ্ছেদ অভিযানের পরিসর, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে তাঁর দেওয়া তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে আসামের ইতিহাসে ‘লাইন প্রথা’র প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় এক শতাব্দী আগে নগাঁও অঞ্চলে বাংলাভাষী মুসলমান কৃষকদের বসবাসের এলাকা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে যে ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তার ঐতিহাসিক প্রভাব এখনো অনুভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ভাষ্য পরিবর্তিত হলেও বাংলাভাষী মুসলমানদের পরিচয় ও বসবাসের অধিকার নিয়ে বিরোধের ধারাবাহিকতা রয়ে গেছে। তাঁর মতে, বর্তমান উচ্ছেদ অভিযানকে এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হবে।

পোস্টে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মাত্র দুই দিনে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ১ হাজার ১০০টির বেশি বাড়িঘর এবং ১০টিরও বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত ৩৩টি উচ্ছেদ অভিযানে ২২ হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এসব সংখ্যার পক্ষে বিস্তারিত নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা পরিসংখ্যান তাঁর পোস্টে তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা, উচ্ছেদের আইনি ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজ্যটির পুরোনো জাতিগত বিরোধকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এর ফলে বাংলাভাষী মুসলমানরা বিশেষভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়ছেন। তিনি মনে করেন, ভাষাগত পরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয়কে একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা ওই জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এটি নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার ও বিজেপির বক্তব্য ছাড়া বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি থেকে ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়ার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), ভোটার তালিকা, আধার কার্ড এবং কথিত ‘পুশব্যাক’ কার্যক্রমের প্রসঙ্গও এসেছে। নাহিদের অভিযোগ, এসব ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাভাষী মুসলমানদের একটি অংশ নাগরিক অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। তবে এনআরসি থেকে বাদ পড়া মানেই প্রত্যেক ব্যক্তির চূড়ান্তভাবে নাগরিকত্বহীন হয়ে যাওয়া নয়; প্রত্যেকের আইনি অবস্থা ও প্রযোজ্য প্রক্রিয়া আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্কও তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, ঔপনিবেশিক আমলে সিলেট ও আশপাশের অঞ্চলের প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের ফলে বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালের গণভোটের পর সিলেটের অধিকাংশ পূর্ববঙ্গে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জসহ কিছু এলাকা আসামের অংশে থেকে যায়। তাঁর মতে, এই ইতিহাসের কারণে বরাক উপত্যকার মানুষের সংকট বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছেও আবেগ ও আত্মীয়তার বিষয়।

বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে যৌথ ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে ১১ জনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ভাষার দাবিতে ওই আন্দোলন প্রমাণ করে যে বাংলাভাষার প্রশ্নে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ১৯৭২ ও ১৯৮৬ সালের ভাষা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বরাক উপত্যকার ভাষাশহীদদের ইতিহাস বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও বাঙালির বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলাভাষী মুসলমানদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের আশায় তাঁদের একটি অংশ অসমীয়া ভাষা ও পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন। কিন্তু তারপরও তাঁদের অনেককে ‘বাংলাদেশি’ বা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, এই বাস্তবতা দেখায় যে ভাষা পরিবর্তন বা সাংস্কৃতিক অভিযোজনের মাধ্যমেও সব ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এই অভিজ্ঞতা কতটা বিস্তৃত এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এর ধরন কী, তা বুঝতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে নাহিদ ইসলাম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আসামের চরাঞ্চলে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষায় ভাসানীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদাও’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান বাংলাভাষী মুসলমানদের নাগরিক মর্যাদা ও বসবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে নাহিদ মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, ভাসানীর আন্দোলনের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় যে আসামের বাঙালি মুসলমানদের উপস্থিতি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়; এটি বহু প্রজন্মের বসবাস, শ্রম ও সামাজিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আসামের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, সীমান্তে নজরদারি ও কূটনৈতিক চিঠি বিনিময়ের পাশাপাশি উচ্ছেদ এবং কথিত পুশব্যাকের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তিনি বিএনপি সরকারের কাছে এ বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকি, মানবাধিকার এবং সীমান্ত দিয়ে মানুষকে জোর করে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা তোলার প্রস্তাব দেন।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশ যেন কোনো পরিস্থিতিতেই জোরপূর্বক পুশইন বা অনিয়মিত প্রত্যাবাসন মেনে না নেয়, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এ ধরনের জটিল সীমান্ত ও নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে কূটনৈতিক যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি সতর্ক করে বলেন, আসামের পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা উল্টো ওপারে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও নিপীড়নের পরিবেশকে আরও জোরদার করতে পারে। তাঁর মতে, বাংলাদেশকে নিজের মানবিক ও নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে এবং দেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য মূলত ইতিহাস, নাগরিকত্ব, মানবাধিকার ও আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর উত্থাপিত অভিযোগ ও পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাই যেমন প্রয়োজন, তেমনি উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের দুই পাশে মানুষের ভাষা, পরিবার ও ইতিহাসের সম্পর্ক থাকলেও নাগরিকত্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আইনি কাঠামো প্রযোজ্য। এ কারণে মানবিক উদ্বেগের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ও দায়িত্বশীল কূটনৈতিক পদক্ষেপই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com