লুলার ঐতিহাসিক জয়, চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
লুলার ঐতিহাসিক জয়, চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জয় শুধু ক্ষমতাসীন নেতার পুনর্নির্বাচন নয়, বরং দেশটির গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোটে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ নিশ্চিত করেছেন লুলা। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থান এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁকে আলোচিত করে রেখেছে।

ব্রাজিলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা সংখ্যায় ৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৬ হাজার ২৩২ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ বা ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৬ হাজার ৪১ ভোট। দুই প্রার্থীর ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ভোট। ফলাফলটি ছিল হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি, যেখানে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ বামপন্থী নেতা লুলার পক্ষেই রায় দিয়েছেন দেশটির ভোটাররা।

প্রথম দফার নির্বাচনে চিত্র ছিল ভিন্ন। ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো প্রায় ৪৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম অবস্থানে ছিলেন। লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট। কোনো প্রার্থী বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি না পাওয়ায় নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায়। সেই ভোটেই ব্যবধান ঘুচিয়ে লুলা প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলেন। ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে প্রথম দফায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীর দ্বিতীয় দফায় হেরে যাওয়ার এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

লুলার এই জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তিনি ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এরপর বহু বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর ২০২২ সালের নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে পরাজিত করে আবার ক্ষমতায় ফেরেন। ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর এবার নতুন মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হলেন তিনি। ফলে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন মেয়াদ শুরু হলে এটি হবে তাঁর চতুর্থ প্রেসিডেন্সি, যদিও চারটি মেয়াদ একটানা নয়।

লুলার রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শ্রমজীবী মানুষ, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর প্রশ্নে তাঁর অবস্থান। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও সরকারি পরিষেবার প্রসারকে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, সরকারি ব্যয় এবং দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এবারের নির্বাচনে এই দুই ধরনের মূল্যায়নই ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে।

লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে এবং একজন সিনেটর। তাঁর প্রচারে রক্ষণশীল মূল্যবোধ, আইনশৃঙ্খলা, করনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করে, লুলার সরকারের পরিবর্তে ডানপন্থী নেতৃত্ব দেশকে ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পথে নিতে পারত। অন্যদিকে লুলার সমর্থকেরা বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফলে নির্বাচনটি কেবল দুই ব্যক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না; বরং ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতি ও গণতান্ত্রিক পথনির্দেশ নিয়েও ছিল বড় ধরনের লড়াই।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর লুলা সব ব্রাজিলীয় নাগরিকের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, যাঁরা তাঁকে ভোট দিয়েছেন এবং যাঁরা দেননি—রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সবার প্রতিই তাঁর দায়িত্ব থাকবে। রাজনৈতিক মেরুকরণে বিভক্ত দেশকে একত্র করা তাঁর নতুন মেয়াদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কারণ নির্বাচনে লুলা জয়ী হলেও প্রায় অর্ধেক বৈধ ভোট পড়েছে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে। এই বাস্তবতা দেখায়, ব্রাজিলের সমাজে ডান ও বামপন্থী রাজনীতির বিভাজন এখনো গভীর।

ফ্লাভিও বলসোনারো অবশ্য ফলাফল মেনে নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন এবং নির্বাচনের ফল বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। ভোটগ্রহণের সময় শেষ মুহূর্তে দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তবে ভোটের সময় বাড়ানোর অনুরোধ দুই প্রার্থীর পক্ষ থেকেই এসেছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত গণনা শেষে লুলার জয় ঘোষণা করেছে। এখন এই বিরোধের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।

লুলার জয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের নেতৃত্বে বামপন্থী সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যনীতি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্ন বিষয়ে লুলার সরকারের মতপার্থক্য রয়েছে। ফ্লাভিও বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ফলে লুলার পুনর্নির্বাচন ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে লুলার অবস্থানও তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির একটি বড় অংশ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তাঁর কঠোর সমালোচনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তাঁর বক্তব্যের সমর্থকেরা একে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার পক্ষে অবস্থান হিসেবে দেখেন; সমালোচকেরা আবার তাঁর কিছু মন্তব্যকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে করেন। তবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর অবস্থান যে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দৃশ্যমান করেছে, তা স্পষ্ট।

নতুন মেয়াদে লুলার সামনে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জও কম নয়। সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, আমাজন বনাঞ্চল রক্ষা এবং কৃষি ও শিল্প খাতের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করাও তাঁর সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল; ফলাফল ঘোষণার পর বাজারে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রাজিলের জনগণের প্রত্যাশাও এখন বড়। লুলার সমর্থকেরা তাঁর বিজয়কে সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের পক্ষে রায় হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একটি অংশ তাঁর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে হলে নতুন সরকারকে শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেই চলবে না, বিরোধী মতের নাগরিকদের আস্থাও অর্জন করতে হবে।

সব মিলিয়ে, ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে লুলার জয় ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় জয় ছিনিয়ে নিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, নির্বাচনের শেষ পর্যায়েও ভোটারদের সমর্থনের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। তবে নির্বাচনী জয়ই তাঁর সামনে থাকা সব সমস্যার সমাধান নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী রাখা, রাজনৈতিক বিভাজন কমানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামাজিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই হবে নতুন মেয়াদে তাঁর সাফল্যের প্রধান পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com