মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ।

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ।
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির হিসাবে ২০২৬ সালে আবারও ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলারে। অন্যদিকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। অর্থাৎ এই সূচকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ব্যবধান দাঁড়াতে পারে ১৩৭ ডলার। তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকা মানেই অর্থনীতির সামগ্রিক শক্তি কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানে এগিয়ে থাকা নয়। অর্থনীতির মোট আকার, ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি ও আয়বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

আইএমএফের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে দুই দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে এই পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনার পাশাপাশি ভারতের বড় অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং বাংলাদেশের সামনে থাকা নানা চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়েছে। পূর্বাভাসটি বাস্তবায়িত হলে ২০২০ সালের পর আবারও এই সূচকে ভারতকে পেছনে ফেলবে বাংলাদেশ। তবে এটি এখনো পূর্বাভাস, চূড়ান্ত হিসাব নয়। বছর শেষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যা, বিনিময় হারসহ বিভিন্ন উপাদানের পরিবর্তনে প্রকৃত পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

মাথাপিছু জিডিপি বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে গড় পাওয়া যায়, তাকে বোঝায়। এই সূচক দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের তুলনায় জনপ্রতি গড় অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়। তবে এটি প্রত্যেক নাগরিকের আয় নয়। দেশের সব মানুষ সমান আয় করেন, এমন ধারণাও এই হিসাব থেকে পাওয়া যায় না। কারও আয় অনেক বেশি, কারও আয় কম কিংবা কেউ কর্মহীন—এসব পার্থক্য মাথাপিছু জিডিপির গড় সংখ্যায় সরাসরি প্রকাশ পায় না।

এখানে মাথাপিছু জিডিপি ও মাথাপিছু জাতীয় আয়ের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপি হিসাব করা হয় দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার ভিত্তিতে। অন্যদিকে জাতীয় আয়ের হিসাব করতে বিদেশ থেকে পাওয়া নিট প্রাথমিক আয়সহ অতিরিক্ত কিছু বিষয় বিবেচনা করা হয়। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বহু পরিবারের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সেটিকে সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অংশ হিসেবে গণনা করা হয় না। ফলে মাথাপিছু জিডিপির পরিসংখ্যান দিয়ে প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে পরিবারের হাতে আসা অর্থের পূর্ণ প্রভাব বোঝা যায় না।

মোট অর্থনীতির আকারের হিসাবে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের মোট জিডিপি প্রায় ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হতে পারে প্রায় ৫০৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের পরিমাণে ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের প্রায় আট গুণ। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, বড় জনসংখ্যা, কৃষি ও উৎপাদনশিল্পের পাশাপাশি প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা এবং অন্যান্য পরিষেবা খাত ভারতের অর্থনীতিকে বিস্তৃত ভিত্তি দিয়েছে। তাই জনপ্রতি গড় উৎপাদনের একটি সূচকে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার পূর্বাভাসকে দুই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শক্তির সরাসরি তুলনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গত দুই দশকে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয়, রপ্তানিমুখী উৎপাদন এবং শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবা খাতের সম্প্রসারণও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। এসব অগ্রগতির প্রভাব মাথাপিছু উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হতে পারে।

তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে নানা চাপের মুখে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্য, পরিবহন, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার খরচ বেড়ে গেলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। আয় বাড়লেও যদি সেই তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি বাড়ে, তাহলে পরিবারের হাতে থাকা অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয় না। ফলে মাথাপিছু জিডিপি বাড়ার পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপির হিসাব এই পার্থক্য বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতে কতটা পণ্য ও সেবা কেনা যায়, তা দুই দেশের মূল্যস্তর বিবেচনায় নিয়ে পিপিপি হিসাব করা হয়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপির ভিত্তিতে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় মূল্যস্তর ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় ভারত এগিয়ে থাকবে।

তবে পিপিপির পরিসংখ্যানও ব্যক্তিগত আয় বা সম্পদের সরাসরি মাপকাঠি নয়। এটি মূলত দুই দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদন ও মূল্যস্তরের তুলনাকে আরও অর্থবহ করে। একইভাবে মাথাপিছু জিডিপি বা পিপিপি—কোনো একক সূচক দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, পুষ্টি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা কিংবা আয়বৈষম্যের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। মানুষের প্রকৃত জীবনমান মূল্যায়নে এসব সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা ২০২৭ ও ২০২৮ সালেও বজায় থাকতে পারে। ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলার এবং ভারতের ৩ হাজার ৩৬ ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে ২০২৯ সালে চিত্র পাল্টে যেতে পারে। ওই বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছানোর বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি এই পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির গতি বেশি হলে ব্যবধান আবার ভারতের পক্ষে যেতে পারে।

ভারতের অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের অবদানের বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদন খাতের অবদান ২০১৪ সালে ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের মূল্য সংযোজনের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই তুলনা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্পের বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে উৎপাদন খাতের অবদান বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চ উৎপাদনশীলতা, ভালো মজুরি কিংবা সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত হয় না।

বাংলাদেশের সামনে জ্বালানি নিরাপত্তাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্পকারখানার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব উৎপাদন খরচ, পণ্যের দাম এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর পড়তে পারে।

তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে ভারতের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার এবং তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত উৎপাদন ও সেবা খাত অর্থনীতিকে বিভিন্ন উৎস থেকে সহায়তা দেয়। বাংলাদেশের জন্য তাই রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নতুন বাজার তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করা এবং জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দুই দেশের অর্থনীতিতেই আয় ও সম্পদের বৈষম্য একটি বড় আলোচ্য বিষয়। জাতীয় উৎপাদন বাড়লেও তার সুফল যদি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে না পৌঁছায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি সীমিত থাকতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যায্য মজুরি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা তাই অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু মাথাপিছু গড় উৎপাদনের অবস্থান নয়, সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনছে, সেটিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আইএমএফের পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তবে এই সম্ভাব্য অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং আয়বৈষম্য কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির মোট আকার ও ক্রয়ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানও বিবেচনায় রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু মাথাপিছু জিডিপির সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মানে কতটা উন্নতি ঘটছে, তার মধ্য দিয়েই আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com