ট্রাকচালক হত্যা মামলায় হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিচার শুরু

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
ট্রাকচালক হত্যা মামলায় হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিচার শুরু
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক মো. হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী ২৫ নভেম্বর থেকে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী বেলাল হোসেন জানিয়েছেন, আগামী ২৫ নভেম্বর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আদালত মামলাটির বিচার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অভিযোগ গঠন মানেই আসামিরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন নয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, জেরা এবং বিচারিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ট্রাকচালক মো. হোসেন। ওই ঘটনায় সাজ্জাদ ও শাহিন নামের আরও দুজন আহত হন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে একজন পেশাজীবী মানুষের প্রাণহানি এবং অন্যদের আহত হওয়ার ঘটনা পরবর্তী সময়ে আইনি পদক্ষেপের দিকে গড়ায়। নিহত হোসেনের পরিবারের কাছে এই মামলা শুধু একটি বিচারিক কার্যক্রম নয়, বরং প্রিয়জন হারানোর ঘটনায় দায় নির্ধারণ এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত।

হোসেনের মা মোসাম্মৎ রীনা বেগম ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ প্রথমে ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে পুলিশ তদন্ত করে অভিযোগের পরিধি বাড়ায় এবং মোট ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তদন্ত শেষে গত বছরের ২৩ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক মো. আকরামুজ্জামান আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন বলে মামলার বিবরণে বলা হয়েছে।

একটি হত্যা মামলার তদন্তে সাধারণত ঘটনার সময়, স্থান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আহত ব্যক্তিদের বিবরণ, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত যাচাই করা হয়। তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করলেও আদালতে অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা ও আসামিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ মামলায়ও অভিযোগ গঠন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। সাক্ষীরা আদালতে তাঁদের বক্তব্য দেবেন এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের জেরা করার সুযোগ পাবেন। এরপর আদালত উপস্থাপিত প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন।

মামলাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান, আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজিব, শেখ বজলুর রহমান এবং নুর মোহাম্মদ সেন্টুসহ অনেকে। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে দায় নির্ধারিত হবে।

আদালত সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, মামলার ৩৪ আসামির মধ্যে ২০ জন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে গত ২৬ জানুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। এদিকে জুনাইদ আহমেদ পলক ও সাদেক খানসহ চারজন কারাগারে আটক রয়েছেন। আরও ১০ জন জামিনে আছেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের অবস্থান ও আদালতে উপস্থিতির বিষয়টি বিচার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পলাতক আসামিদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া মামলার অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে। এসব মামলায় একদিকে নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রত্যাশা করছে, অন্যদিকে অভিযুক্তদেরও আইন অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ, উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ এবং আদালতের স্বাধীন মূল্যায়ন অপরিহার্য।

ট্রাকচালক হোসেন হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ সেই বিচারিক প্রক্রিয়ারই একটি ধাপ। অভিযোগ গঠনের আগে আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন বিবেচনা করেছেন। আবেদন নাকচ হওয়ার পর মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের দিকে এগোচ্ছে। আগামী ২৫ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে মামলার অভিযোগের পক্ষে সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। সাক্ষ্যগ্রহণের পর প্রয়োজন অনুযায়ী জেরা, অন্যান্য প্রমাণ যাচাই এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে মামলাটি পরবর্তী পর্যায়ে এগোবে।

নিহত হোসেনের পরিবারের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেই প্রভাবিত করে না; স্বজনদের জীবনে তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী শোক ও অনিশ্চয়তা। এ ধরনের মামলায় পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার পাশাপাশি সাক্ষীদের নিরাপত্তা, প্রমাণের সুরক্ষা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে মামলার চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা আগাম নির্ধারণের সুযোগ নেই; আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

মামলাটির বিচার শুরু হওয়ায় এখন মূল নজর থাকবে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং পরবর্তী আদালতীয় কার্যক্রমের দিকে। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় কি না, পলাতক আসামিদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ কীভাবে মূল্যায়িত হয়—এসব বিষয় মামলার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আইনি অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও বিচার শুরুর আদেশ মামলাটিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আগামী ২৫ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। নিহতের পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার—দুই দিক বিবেচনায় রেখে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com