স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী সাংবাদিকতার ভূমিকা স্মরণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাহসী সাংবাদিকতার ভূমিকা স্মরণ
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং সংকটময় সময়ে মানুষের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা, জনমত গঠন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তাঁর মতে, গিয়াস কামাল চৌধুরী, আতাউস সামাদ ও ফয়েজ আহমেদের মতো সাংবাদিকেরা সততা, নীতিবোধ, পেশাগত নিষ্ঠা এবং সাহসিকতার মাধ্যমে সাংবাদিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁদের পেশাগত আদর্শ বর্তমান সময়েও সাংবাদিকদের জন্য প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সমিতি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন। সভায় তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা, সাংবাদিকদের পেশাগত চ্যালেঞ্জ এবং সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁদের সাহসিকতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে প্রয়াত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতিও স্মরণ করেন তিনি।

রিজভী বলেন, গিয়াস কামাল চৌধুরী, আতাউস সামাদ ও ফয়েজ আহমেদের মতো সাংবাদিকেরা সত্যনিষ্ঠা, নীতিবোধ ও আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন। তাঁদের দৃঢ় অবস্থান এবং সাহসী ভূমিকা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে এমন এক সময়ের কথা, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সংবাদ জানা অনেক মানুষের জন্য সহজ ছিল না। সে সময় সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের দায়িত্ব শুধু তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং চাপের মধ্যেও পেশাগত সততা বজায় রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

আলোচনা সভায় এরশাদ শাসনামলের সংবাদ পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে রিজভী বলেন, তখন দেশের মানুষ জাতীয় রাজনীতি ও আন্দোলনের খবর জানার জন্য বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকার ওপর নির্ভর করতেন। ভয়েস অব আমেরিকার সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী এবং বিবিসির সাংবাদিক আতাউস সামাদের সংবাদ পরিবেশন মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেত। তাঁদের কণ্ঠে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্দোলন ও বিভিন্ন কর্মসূচির খবর শুনতেন শ্রোতারা। ফলে দেশের বাইরে থেকে প্রচারিত সংবাদও অনেক মানুষের কাছে তখনকার বাস্তবতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সেই সময়ের যোগাযোগব্যবস্থা ও সংবাদপ্রবাহের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিস্তারের কারণে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু অতীতে সংবাদ পাওয়ার মাধ্যম ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্দোলন কিংবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা সাংবাদিকদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারত। রিজভীর বক্তব্যে উঠে আসা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সেই সময় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা বুঝতে সহায়তা করে।

রিজভী বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও গিয়াস কামাল চৌধুরী সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রেখেছিলেন। এমনকি তিনি কোথা থেকে সংবাদ পাঠাচ্ছেন, তা গোপন রাখার প্রয়োজনও দেখা দিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে রিজভী সেই সময়ের সাংবাদিকতার ঝুঁকি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিকূল পরিবেশেও সংবাদ পরিবেশনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গিয়াস কামাল চৌধুরীকে মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ বা প্রচারের কারণে সাংবাদিকদের চাপের মুখে পড়তে হলে তা সংবাদপ্রবাহ এবং জনসাধারণের তথ্য জানার সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত নীতিমালা নিয়ে আলোচনা গণতান্ত্রিক সমাজে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সংগ্রহ এবং ভুল হলে তা সংশোধনের মতো দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রিজভী তাঁর বক্তব্যে সে সময়ের সাংবাদিকদের নীতিবান, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তাঁদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হলেও অনেকেই নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর মতে, এই পেশাগত নিষ্ঠা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রত্যাশা ও চাপ থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করে তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।

সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমের কাজ কেবল কোনো ঘটনা সম্পর্কে তথ্য জানানো নয়; ঘটনার প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাবও তুলে ধরা। বিশেষত রাজনৈতিক আন্দোলন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সংবাদে তথ্যের নির্ভুলতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কোনো অভিযোগ বা বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তার উৎস স্পষ্ট করা এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা পাঠকের আস্থা অর্জনে সহায়তা করে।

আলোচনা সভায় গিয়াস কামাল চৌধুরীর সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিও তুলে ধরেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি জানান, ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর গিয়াস কামাল চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার দক্ষতা এবং তরুণদের প্রতি স্নেহশীল আচরণ রিজভীকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর স্মৃতিচারণায় গিয়াস কামাল চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবেই নয়, বরং তরুণদের প্রতি আন্তরিক ও অভিভাবকসুলভ আচরণের অধিকারী একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবেও উঠে আসেন।

রিজভীর বক্তব্যে গিয়াস কামাল চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের এই দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও একজন মানুষের আচরণ, সহমর্মিতা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর সামাজিক প্রভাবকে বিস্তৃত করতে পারে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে তরুণেরা পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। রিজভীর স্মৃতিচারণা সেই আন্তঃপ্রজন্ম সম্পর্কের একটি ব্যক্তিগত দিক তুলে ধরে।

আলোচনা সভার শেষ পর্যায়ে রুহুল কবির রিজভী প্রয়াত গিয়াস কামাল চৌধুরীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রয়াত সাংবাদিকের পেশাগত অবদান ও ব্যক্তিগত গুণাবলির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। সভায় সাংবাদিকতার ইতিহাস, রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং পেশাগত আদর্শের গুরুত্ব নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা অতীতের অভিজ্ঞতাকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ভূমিকা এবং গিয়াস কামাল চৌধুরী, আতাউস সামাদ ও ফয়েজ আহমেদের মতো সাংবাদিকদের পেশাগত অবদানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সংবাদ পরিবেশন, নীতির প্রতি অবিচল থাকা এবং তরুণদের প্রতি আন্তরিকতার বিভিন্ন দিক। সংবাদমাধ্যমের কাজ ও দায়িত্ব নিয়ে বর্তমান সময়ের আলোচনায় অতীতের এসব অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তথ্যের যথার্থতা, পেশাগত স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখাই সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার অন্যতম ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com