আমদানি বাড়লেও ছোলার দামে স্বস্তি নেই, চাপে ক্রেতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
আমদানি বাড়লেও ছোলার দামে স্বস্তি নেই, চাপে ক্রেতা
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজানকে সামনে রেখে দেশে ছোলার আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বাজারে এর প্রভাব পড়ছে না ক্রেতাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী। বরং পাইকারি ও খুচরা বাজারে ছোলার দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, রমজানে ইফতারের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার ছোলা। তাই এই পণ্যের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যব্যয়ের ওপর।

চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে ছোলা এসেছে ১৭ হাজার ১৭৭ টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৮১ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই দুই মাসে ছোলার আমদানি বেড়েছে ১৫ হাজার ৭৯৬ টন। কিন্তু আমদানির এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাজারে দাম কমার পরিবর্তে উল্টো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত এক থেকে দুই মাসে প্রতি কেজি ছোলার দাম বেড়েছে প্রায় ১৭ থেকে ২১ টাকা। বর্তমানে প্রতি মণ ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকায়। এতে প্রতি কেজির পাইকারি দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৯ থেকে ১০১ টাকা। আগে একই বাজারে প্রতি মণ ছোলা বিক্রি হতো ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, খুচরা বাজারে মান ও বাজারভেদে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টাকায়।

ছোলার আমদানি বাড়ার পরও দাম বৃদ্ধির এই চিত্র বাজারের সরবরাহ, আমদানিমূল্য ও বিপণনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীদের একাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়াকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরবরাহ ও আমদানির তথ্যের পাশাপাশি মজুদ, বিক্রয়মূল্য এবং বাজারে পণ্যের চলাচলও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ছোলার চাহিদা সারা বছর এক রকম থাকে না। স্বাভাবিক সময়ে মাসে ছোলার চাহিদা প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রমজানে ইফতারকেন্দ্রিক চাহিদা বেড়ে মাসে প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এই বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় আমদানিকারকেরা সাধারণত আগেভাগে পণ্য আমদানি ও মজুদের পরিকল্পনা করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫ টন ছোলা আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার টন। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরের হিসাবে আমদানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন না থাকলেও নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্যেও ছোলার আমদানি ও আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার পরিমাণ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলার আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি বেশি হলেই স্থানীয় বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আমদানি করা পণ্য বাজারে পৌঁছানোর আগে ক্রয়মূল্য, জাহাজভাড়া, বন্দরসংক্রান্ত ব্যয়, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হয়। পুরোনো মজুদ কমে গেলে নতুন করে বেশি দামে কেনা পণ্যের প্রভাবও বাজারে পড়তে পারে। ফলে আমদানির পরিমাণ বাড়লেও পণ্যটি কোন দামে কেনা হয়েছে, কতটুকু বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের কাছে কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে, সেসব তথ্য মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার বুকিং দর বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন কমার পূর্বাভাসের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার বুকিং দর একপর্যায়ে প্রতি টন ৮৫০ মার্কিন ডলারে উঠেছিল। পাশাপাশি দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পরিবহন ব্যয় বাড়িয়েছে বলেও ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিস্থিতির পেছনে উৎপাদনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তারও ভূমিকা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নিউজের ১৭ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে দেশটিতে ছোলার উৎপাদন চলতি মৌসুমে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন কমার আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশের আমদানিকারকেরা আগেভাগে সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির চাহিদা ও দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের বাজারে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ছোলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিকারকদের নতুন চালানের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাজারে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নির্ধারণের জন্য আমদানির চালানভিত্তিক ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং বিক্রয়মূল্যের তথ্য তুলনা করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের মৌসুমের তুলনামূলক কম দামে কেনা ছোলার মজুদ শেষ হয়ে এলে নতুন দামের পণ্য বাজারে আসার প্রভাব দেখা দিতে পারে। নতুন ফসল বাজারে আসা এবং সরবরাহ বাড়ার পর আন্তর্জাতিক দাম কমলে দেশেও মূল্যচাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহের ধারাবাহিকতার ওপর।

ছোলা শুধু একটি আমদানিনির্ভর পণ্য নয়; বাংলাদেশের বহু পরিবারের কাছে এটি রমজানের ইফতারের পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে ছোলা ভুনা, মসলা মেশানো ছোলা এবং অন্যান্য ইফতারসামগ্রী তৈরিতে এর ব্যবহার ব্যাপক। ফলে রমজানের আগে ছোলার দাম বাড়লে পরিবারের খাদ্যতালিকা ও ব্যয় পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়।

একটি পরিবারের জন্য প্রতি কেজি ছোলার দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে যাওয়া সামান্য বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে চিনি, তেল, ডাল, খেজুরসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়লে মাসিক বাজার খরচের ওপর সম্মিলিত চাপ তৈরি হয়। যেসব পরিবার সীমিত আয়ে সংসার পরিচালনা করে, তাদের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় আরও বেশি প্রভাব ফেলে।

রমজানের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আগেভাগে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ, চাহিদা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা মজুদ বাড়াতে পারেন। কিন্তু বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও যদি খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে তার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেছেন, অসাধু বাণিজ্য ঠেকাতে রমজানের অপেক্ষা না করে এখন থেকেই ছোলার আমদানি, মজুদ ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানো উচিত।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই শুধু আমদানি বা উৎপাদনসংক্রান্ত কারণকে দায়ী করা যথেষ্ট নয়। আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে কী পরিমাণ পণ্য রয়েছে, কোন দামে পণ্য কেনা হয়েছে এবং কত দামে বিক্রি করা হচ্ছে, সেসব তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারের বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা অনুসন্ধান করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বাজার তদারকি কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন, আমদানি ও মজুদের তথ্য যাচাই এবং পাইকারি-খুচরা দামের ব্যবধান পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সরকারি পর্যায়েও রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য ৯ হাজার টন ছোলা আমদানির প্রস্তাব গত সেপ্টেম্বরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে অনুমোদিত হয়। এই পণ্য সরকারি বিপণন কার্যক্রমে যুক্ত হলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে ছোলা পাওয়ার সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

ছোলার বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; আমদানিকৃত পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বিক্রি নিশ্চিত করাও জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব কতটা যৌক্তিক, আর স্থানীয় বিপণনব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে, তা তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের জন্যও স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হলে বাজার পরিস্থিতি বোঝা সহজ হয়। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হলে তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, ছোলার আমদানি বাড়লেও বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং আমদানি ব্যয়ের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয় বাজারে প্রকৃত সরবরাহ, মজুদ ও বিক্রয়মূল্যের তথ্য যাচাই ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির সম্পূর্ণ কারণ নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। রমজানের আগে নিয়মিত বাজার তদারকি, সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অযৌক্তিক মূল্যচাপ কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সহায়তা মিলতে পারে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com