টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যৌথ সমৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জাপানের অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন। জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রেলপথ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন আগ্রহের কথা তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এখন এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে জাপানের শিল্পপ্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যেও এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি জানান, তাঁর সরকার উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, বিদ্যমান শিল্পের আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে হলে শুধু আগ্রহ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা, সহজ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশের জন্য তাই জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় জ্বালানি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে জাপানি প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব। বিশেষ করে তরুণদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
রেলপথ ও অবকাঠামো উন্নয়নেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন রয়েছে। উন্নত পরিবহনব্যবস্থা পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমাতে, শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বন্দর ও বাজারের সংযোগ বাড়াতে এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে গতিশীল করতে সহায়তা করে। একইভাবে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বন্দরসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগ জোরদারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। দুই দেশের আলোচনার ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অভিন্ন অগ্রাধিকার একটি যৌথ বিবৃতিতে তুলে ধরা হবে বলে জানান তারেক রহমান।
সফরের প্রস্তুতিপর্বে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এসব খাতে চূড়ান্তভাবে কী কী উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, তা যৌথ বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
সমঝোতা স্মারক বিনিময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা, অর্থায়ন, দায়িত্ব বণ্টন এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে এসব উদ্যোগ দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম জাপান। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক প্রকল্পে ভূমিকা রেখে আসছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মধ্য দিয়েও এ সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা গড়ে উঠলে নতুন বাজার সৃষ্টি, জ্ঞান বিনিময় এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে তারেক রহমান ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও গেছেন। ২৬ অক্টোবর সফরের প্রথম দিনে তিনি জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বাধীন সংসদীয় প্রতিনিধিদল, মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পে জাপানের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সফরের অন্যান্য কর্মসূচিতে শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ গড়ে তোলার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এর সুফল পেতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত পূরণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আলোচনায় উঠে আসা অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নের গতি এবং বিনিয়োগের সুফল কতটা বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় তার ওপর।
জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণ করা গেলে তার সুফল দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বকে শুধু ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মারক হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সুযোগ ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এখন দুই দেশের ঘোষিত অঙ্গীকার কতটা বাস্তব উদ্যোগে পরিণত হয়, সেটিই হবে এই সফরের সাফল্য মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত