পশুর নদীতে কয়লাবোঝাই জাহাজডুবি, রক্ষা পেলেন ৯ জন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
পশুর নদীতে কয়লাবোঝাই জাহাজডুবি, রক্ষা পেলেন ৯ জন
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারের ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন কয়লাবোঝাই একটি কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) গভীর রাতে সুন্দরী কোঠা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে জাহাজে থাকা নয়জন কর্মী সাঁতরে পাশের একটি কার্গো জাহাজে উঠতে সক্ষম হওয়ায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

ডুবে যাওয়া জাহাজটির নাম এমভি ফুলবাড়ী। এটি আইআরএস ইন্টারন্যাশনালের মালিকানাধীন বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার স্থানটি মূল নৌচ্যানেলের বাইরে হওয়ায় পশুর চ্যানেল দিয়ে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। একই সঙ্গে ডুবে যাওয়া জাহাজটি দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজের কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোংলা বন্দরের হিরণ পয়েন্টে অবস্থানরত বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি ইয়াস জুপিটার থেকে কয়লা বোঝাই করে মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল এমভি ফুলবাড়ী। জাহাজটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল। পরে কয়লাবোঝাই জাহাজটি পশুর চ্যানেলের সুন্দরী কোঠা এলাকায় পৌঁছালে এমটি জান্নাতুল ফেরদৌস নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।

ধাক্কার পর কার্গো জাহাজটি ডুবে যায়। আকস্মিক এ ঘটনায় জাহাজের কর্মীদের সামনে বড় ধরনের বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হলেও তাঁরা দ্রুত সাঁতরে পাশের একটি কার্গো জাহাজে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন। ফলে জাহাজে থাকা নয়জনের সবাই প্রাণে বেঁচে যান।

তবে সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ, দুই জাহাজের গতিপথ ও অবস্থান এবং দুর্ঘটনার সময় নৌযান পরিচালনায় কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হবে।

জাহাজের কর্মীরা জানান, এমভি ফুলবাড়ীতে বোঝাই করা কয়লা নিয়ে ঢাকার বাদামতলায় যাওয়ার সময়সূচি ছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই দুর্ঘটনায় জাহাজটি নদীতে ডুবে যায়। এতে জাহাজটির মালিকপক্ষের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কয়লা পরিবহন কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাহাজডুবির ফলে কয়লাবোঝাই পণ্য কী অবস্থায় রয়েছে, কতটা কয়লা উদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং উদ্ধার কার্যক্রমে কত সময় লাগতে পারে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাহাজের কাঠামো ও নদীর তলদেশে এর অবস্থান বিবেচনা করে উদ্ধার পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে ডুবে থাকা জাহাজটি যেন অন্য নৌযানের চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন।

কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজের দুর্ঘটনা শুধু মালিকপক্ষের পণ্য ও সম্পদের ক্ষতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে নৌপথের নিরাপত্তা, পণ্য পরিবহনের ধারাবাহিকতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও জড়িত। তাই উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, পশুর চ্যানেল সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে এবং এ পথে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক আছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডুবে যাওয়া জাহাজটি মূল চ্যানেলের বাইরে থাকায় বন্দরের নৌচলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়নি।

তিনি আরও জানান, জাহাজের মালিকপক্ষ দ্রুত সেটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করবে। উদ্ধারকাজ সময়মতো সম্পন্ন করা গেলে নদীপথে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমানো সম্ভব হবে।

মোংলা বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এ বন্দরের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে বন্দরের নৌপথ নিরাপদ ও সচল রাখা জাতীয় বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার পরও নৌযান চলাচল স্বাভাবিক থাকার তথ্য তাই তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে মূল চ্যানেল আপাতত নিরাপদ থাকলেও ডুবে থাকা জাহাজের অবস্থান চিহ্নিত রাখা, আশপাশের নৌযানকে সতর্ক করা এবং উদ্ধারকাজের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নদীর স্রোত, পানির গভীরতা ও জাহাজের অবস্থানের ওপর উদ্ধারকাজের অগ্রগতি নির্ভর করতে পারে।

পশুর নদী সুন্দরবনসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এ নদী দিয়ে নিয়মিত পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে। তাই কয়লাবোঝাই জাহাজডুবির ঘটনায় সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। জাহাজের কয়লা নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, কতটা পণ্য পানির নিচে রয়েছে এবং উদ্ধারকাজের সময় দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কা আছে কি না, এসব বিষয় যাচাই করা দরকার।

কয়লা পানিতে মিশে গেলে নদীর তলদেশে জমা হতে পারে এবং পানির গুণগত মান ও জলজ পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ দুর্ঘটনায় ইতিমধ্যে কী পরিমাণ দূষণ ঘটেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই পরিবেশের ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

দ্রুত কয়লা উদ্ধার এবং নদীতে ছড়িয়ে পড়া রোধের ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত রাখার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও পদ্ধতি যেন নদীর পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

পশুর নদীতে বিভিন্ন আকারের পণ্যবাহী জাহাজ, ট্যাংকার ও অন্যান্য নৌযান চলাচল করে। এ ধরনের ব্যস্ত জলপথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, নৌযানের গতি নিয়ন্ত্রণ, নাবিকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং নৌপথের নির্দেশনা অনুসরণ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এমভি ফুলবাড়ী ও এমটি জান্নাতুল ফেরদৌসের সংঘর্ষের কারণ তদন্ত করে দেখা হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করা সহজ হবে। তদন্তে নৌযানের চলাচল, আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতি, নাবিকদের কার্যক্রম এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কোনো পক্ষের অবহেলা বা দায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

সব মিলিয়ে, পশুর নদীতে কয়লাবোঝাই এমভি ফুলবাড়ী ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো—জাহাজের নয়জন কর্মী নিরাপদে অন্য জাহাজে আশ্রয় নিতে পেরেছেন এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এখন দ্রুত জাহাজ ও কয়লা উদ্ধারের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব যাচাই এবং নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com