কক্সবাজারের উখিয়ায় অভিযানে উদ্ধার হওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগের তীব্রতা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম কিবরিয়াকে নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান। গত ২৫ অক্টোবর অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার ঘটনা সামনে আসার পর পুলিশের ভূমিকা, উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছৈয়দুল বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করে পুলিশ। অভিযানে এসআই গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে একটি দল অংশ নেয়। অভিযোগকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরিচয় দেওয়া সরওয়ার সিকদারের দাবি, ওই অভিযানে মোট দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহারে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়। তাঁর অভিযোগ, বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং পরে তা মাদক কারবারিদের কাছে এক কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে উদ্ধার অভিযানের নথি, জব্দতালিকা, মামলার এজাহার, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক ভিডিও ফুটেজ যাচাই করা প্রয়োজন।
সরওয়ার সিকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের পর আটক ছৈয়দুল বশরকে প্রথমে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়িতে এবং পরে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, পরে বালুখালীর জোড়াব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা মাদকের পরিমাণের পার্থক্যই আত্মসাতের অভিযোগের অন্যতম ভিত্তি।
মামলার এজাহারে সাক্ষী হিসেবে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে দেলোয়ার ও সাদ্দাম পুলিশের অভিযান এবং ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় সাক্ষী হিসেবে নাম থাকার বিষয়েও তাঁরা অবগত ছিলেন না। তাঁদের এই বক্তব্য যাচাই করা হলে মামলার নথিতে সাক্ষীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া এবং উদ্ধার অভিযানের বিবরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাসংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁদের মতে, ফুটেজের সঙ্গে জব্দতালিকা, মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখলে অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কত পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল, তা নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। তবে ফুটেজের অস্তিত্ব, তার পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু কিংবা তদন্তে এর প্রাসঙ্গিকতা আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মাদক উদ্ধার ও জব্দের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ, জব্দের স্থান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং সাক্ষীদের পরিচয় যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকলে পরবর্তী সময়ে কোনো অসংগতি দেখা দিলে তা যাচাই করা সহজ হয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণেও এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পুলিশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়। পুলিশ সূত্রের দাবি, ২২ অক্টোবরের অভিযানে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি হিসেবেই এসআই গোলাম কিবরিয়া ও উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু একই অভিযানে আরও এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, অভিযোগের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অভিযোগের প্রকৃতি যাচাই ও প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ সুপার এমন সিদ্ধান্ত নেবেন, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত মাসিক সভায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। তবে এসআই কিবরিয়াকে পুরস্কার দেওয়ার সময় অভিযোগটি কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় ছিল কি না, সে বিষয়ে ওই বক্তব্যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলেই অভিযোগের সত্যতা নাকচ হয়ে যায় না; একইভাবে অভিযোগ ওঠার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধীও হয়ে যান না। বরং পুরস্কার দেওয়ার ভিত্তি, অভিযানের নথি এবং আত্মসাতের অভিযোগ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তের ফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
কক্সবাজারে মাদক উদ্ধার ও পুলিশের হেফাজতে থাকা মাদকের হিসাব নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন ওঠার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে একটি স্থাপনা থেকে তিন লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের অভিযানে আরও দুই লাখ পিস ইয়াবা গায়েব হওয়ার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। তবে ওই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই আগের অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।
কক্সবাজারে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য অপরাধের পরিসংখ্যান, মামলার অগ্রগতি, তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে জেলার সব অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যায় না।
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ ও জব্দের নথি নিয়ে অসংগতি দেখা দিলে শুধু সংশ্লিষ্ট মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে না, মাদকবিরোধী অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। এ কারণে অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনআস্থা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। অভিযোগ-সংক্রান্ত তথ্য তাঁকে পাঠানোর অনুরোধ জানান তিনি এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ এবং সম্ভাব্য তদন্ত নিয়ে তাঁর অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, উদ্ধার হওয়া ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দতালিকা, মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র সামনে আনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, উখিয়ায় এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ এবং এর মধ্যেই সংশ্লিষ্ট এসআইকে পুরস্কৃত করার ঘটনা কক্সবাজারের পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের ভিত্তি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার দিকে নজর থাকবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন; আর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও স্পষ্ট করা উচিত। স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এ ঘটনায় জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত