গণভোটের রায় মানতেই হবে, বললেন এনসিপি নেতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৪ বার
গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানেরও ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেছেন, জনগণের গণরায় উপেক্ষা করে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা ধরে রাখতে পারে না। তাঁর দাবি, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিএনপি সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা না করে ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়েও তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।

বুধবার রাজধানীর বাড্ডা-লিংক রোড এলাকায় আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, জনগণের গণরায়কে উপেক্ষা করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে সরকার ‘নাটক ও তালবাহানা’ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করা হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও ক্ষমতায় থাকার অধিকার থাকবে না।

আলী আহসান জুনায়েদের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রে ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রশ্ন। তাঁর অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তন, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।

এনসিপির এই নেতা বলেন, সরকার জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকটও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। কিন্তু দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ব্যয় এবং জীবনযাত্রার বাড়তি খরচের কারণে মানুষ যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

বিশেষ করে গ্যাসের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। আলী আহসান জুনায়েদের অভিযোগ, গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণশুনানির বিষয়টি গুরুত্ব হারাচ্ছে। তাঁর দাবি, জনগণের মতামত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনায় না নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দাম বাড়ানো হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে আবাসিক পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি ব্যয়ের পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এনসিপির সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন আলী আহসান জুনায়েদ। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে যে সরকার সম্পর্ক রাখতে চায় না, সেই সরকারকে এনসিপিও সহযোগিতা করবে না। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা তাদের ছিল। তবে সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। জনগণের ভোট, মতামত ও অধিকারকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত টেকসই হতে পারে না। তাঁর বক্তব্যে তাই গণভোটের রায়কে রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নটি ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আলী আহসান জুনায়েদের বক্তব্যে সেই বিতর্ক আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠনসহ নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। এনসিপির পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে জনগণের প্রত্যাশা এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে আলী আহসান জুনায়েদের বক্তব্য মূলত এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকারের প্রতি তাদের সমালোচনাকে তুলে ধরে। গণভোটের সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া কী হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে কী ধরনের সমঝোতা তৈরি হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেটিও রাজনৈতিক বিতর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

বুধবারের কর্মসূচিতে শুধু সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইস্যুই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ও সামনে আনে এনসিপি। দলটির নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগের প্রতিবাদে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করেন।

রাজধানীর বাড্ডা-লিংক রোড এলাকার কর্মসূচিতে দলটির নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য ও নিরাপত্তার মতো প্রত্যক্ষ জনজীবনের বিষয়গুলোকে কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে এনসিপি তাদের রাজনৈতিক বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

কর্মসূচিতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ও ঢাকা উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল আমিন এমপি, সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হকসহ মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনসিপির এই কর্মসূচি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একদিকে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি; অন্যদিকে বিরোধী ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনছে। ফলে গণভোট, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আগামী দিনের রাজনৈতিক বিতর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আলী আহসান জুনায়েদের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে তা হলো—ক্ষমতার চেয়ে জনগণের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের রায় যদি কোনো পর্যায়ে সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সরকারকে সেই রায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। তিনি মনে করেন, জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব বাড়াতে পারে।

এদিকে সাধারণ মানুষের জন্য রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের মতো বাস্তব সমস্যাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয়ে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে। ফলে গণভোট বা সাংবিধানিক সংস্কারের মতো জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ব্যয় ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি জনসম্পৃক্ততার নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে।

এনসিপি নেতার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দলটি সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার পরিবর্তে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে গণভোটের রায়, জুলাই সনদ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার দাবিকে সামনে রেখে তারা নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে। আগামী দিনে এসব ইস্যুতে সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও সরব করে তুলতে পারে।

সবশেষে আলী আহসান জুনায়েদের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, তিনি ক্ষমতার বৈধতার প্রশ্নকে সরাসরি জনগণের রায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিও। ফলে গণভোটের রায়, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্ক আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com