প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানিয়েছেন। সফরটি ছিল বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাকে নতুন মাত্রায় নেওয়ার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান যান তারেক রহমান। সফরের মূল আলোচনায় ছিল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মতো বিষয়। সফর শেষে দেশে ফেরার সময় প্রধানমন্ত্রীর বহনকারী বিমানটিও কিছুটা বিলম্বের মুখে পড়ে। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড্ডয়নের আগে উড়োজাহাজটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর সেটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করতে সক্ষম হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রকৌশলী দল ও জাপানি প্রযুক্তিবিদদের সহযোগিতায় ত্রুটিটি সমাধান করা হয়।
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে জাপানের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ বড় আকারের জাপানি বিনিয়োগ এলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপান ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের দুটি ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়, যার পরিমাণ প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর একটি প্রকল্প বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সহায়তা করবে এবং অন্যটি উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হবে।
স্বাক্ষরিত দলিলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েনের অনুদান চুক্তিও রয়েছে। সমুদ্রপথে অপরাধ প্রতিরোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে এই সহযোগিতা ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে পৃথক সমঝোতা ও অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষর করা হয়েছে।
সরকারি পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি খাতেও সহযোগিতার নতুন দরজা খুলেছে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) আয়োজনে বিভিন্ন বাংলাদেশি ও জাপানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এসব সমঝোতার মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদন ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের বেসরকারি খাতের যোগাযোগ আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২৮ অক্টোবর টোকিওতে জেট্রোর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান এবং দেশের সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাত তুলে ধরেন। মোটরগাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ, দ্রুতগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরে জাপানি ব্যবসায়ীদের আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের সংস্কার ও সহায়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জাপানের রাজনৈতিক নেতা, উন্নয়ন সহযোগী ও শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
জাপানের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ছিল সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেইআরএর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। বাংলাদেশের বিশাল শ্রমশক্তি, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জাপানি কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়।
সফরের আরেকটি দিক ছিল জাপানের উন্নত শিল্প, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো সরাসরি পরিদর্শন। ২৭ অক্টোবর ফুতসুতে জেইআরএর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ইচিকাওয়ার নিটসু লজিস্টিকস হাবও পরিদর্শন করেন তিনি। এসব স্থাপনা ঘুরে জাপানের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা নেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।
বৃহস্পতিবার সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী নাগোয়া যান। সেখানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা এবং টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শন করেন। জাপানের বিশ্বখ্যাত মোটরগাড়ি শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও শিল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে ভবিষ্যতে মোটরগাড়ি শিল্পের সম্ভাবনা নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে শিল্প কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সফরকালে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়। প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সহযোগিতাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় কাজে লাগানোর বিষয়টিও এ যোগাযোগে গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের পর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে। এর পরপরই উচ্চপর্যায়ের এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ইঙ্গিত দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসা জাপান দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পেও বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মধ্য দিয়ে তাই শুধু কয়েকটি চুক্তি বা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাংলাদেশ ও জাপানের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি বিস্তৃত রূপরেখা সামনে এসেছে। জ্বালানি থেকে প্রযুক্তি, কৃষি থেকে শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন থেকে অবকাঠামো—বহু খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এসব চুক্তি ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে করা যায়, তার ওপরই সফরের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
চার দিনের সফর শেষে ঢাকায় ফিরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধিদল এখন এসব আলোচনা ও সমঝোতার বাস্তব ফলাফল দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন বিনিয়োগ এলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পের বিকাশ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত জাপানি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। ফলে টোকিও সফর শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত