প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি বিক্রির অভিযোগের মধ্যেই আবারও দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে বর্তমানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যেই আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর দাবি নিয়ে গণশুনানি করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কারিগরি কমিটির সুপারিশ কার্যকর হলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা হতে পারে।
এতে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে ভোক্তার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ শুধু কমিশন বাড়ানোর প্রভাবই নয়, বিশ্ববাজারে এলপিজির মূল্য, জাহাজভাড়া, ডলারের বিনিময় হার এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের কারণে নভেম্বরের নিয়মিত মূল্য সমন্বয়েও দাম বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাবে, নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমেই ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১০০ টাকার বেশি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে কমিশন বৃদ্ধির প্রভাব যোগ হলে সাধারণ পরিবারের রান্নার খরচ আরও বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার দিনভর এলপিজির দাম ও কমিশন পুনর্নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। শুনানিতে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা তাঁদের ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে কমিশন বৃদ্ধির দাবি জানান। পরে এসব প্রস্তাব মূল্যায়ন করে কমিশনের কারিগরি কমিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারে ১৩৯ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ কার্যকর হলে বর্তমান নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা হবে।
তবে গণশুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সময় নেওয়ার সুযোগ থাকলেও আগামী রোববারের মধ্যে মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর হাতে মতামত জানানোর জন্য খুব অল্প সময় থাকছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত না করেই দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে এতে মূলত সাধারণ ভোক্তার ওপরই বাড়তি চাপ পড়বে।
এলপিজির বাজারে চলমান অস্থিরতা নতুন নয়। অক্টোবরের শুরুতে এক দফা দাম বাড়ানো হলেও বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের বহু পরিবার, বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা সীমিত বা নেই, তাদের রান্নার প্রধান জ্বালানি এখন এলপিজি। ফলে সিলিন্ডারের দামের সামান্য পরিবর্তনও মাসিক পারিবারিক বাজেটে সরাসরি প্রভাব ফেলে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এই বাড়তি ব্যয় অনেক সময় খাবার, শিক্ষা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে সামাল দিতে হয়।
বর্তমানে দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এক কোটির বেশি মানুষ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা যায়। ফলে এ খাতে মূল্য নির্ধারণের যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি বিপুলসংখ্যক পরিবারের ওপর পড়ে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসছে। কিন্তু নিয়মিত মূল্য নির্ধারণের পরও বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান কমিশন কাঠামো অনেক আগের। ২০২১ সালে নির্ধারিত হওয়ার পর গত কয়েক বছরে পরিচালন ব্যয়, পরিবহন খরচ, শ্রমিক ব্যয়, ব্যাংকিং খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় বেড়েছে। আমদানিকারকেরা দাবি করছেন, তাঁদের ব্যয়ের সঙ্গে বর্তমান কমিশনের কাঠামোর সামঞ্জস্য নেই। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও একইভাবে নিজেদের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
বর্তমানে প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে মজুত ও বোতলজাত করার জন্য কোম্পানিগুলো ২০০ টাকা কমিশন বা খরচ পায়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ কমিশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা এবং ডেলটা ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। পরিবেশকেরা তাঁদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন করেছেন।
অটোগ্যাসের ক্ষেত্রেও কমিশন বাড়ানোর দাবি এসেছে। অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ২০২১ সালে নির্ধারিত কমিশনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি ও ভোক্তাদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বিইআরসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি, কমিশন যৌক্তিক পর্যায়ে না বাড়ালে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে। তাঁদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত খরচ তুলতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মতে, যথাযথ মূল্য নির্ধারণ করা হলে বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রির প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে এবং সরকারও নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এমন মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ না থাকে। তাঁর মতে, দাম যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করার পর বাজারে ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পরিবেশকদের পক্ষ থেকেও খরচ বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, পরিবহন এবং অব্যবহৃত সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনার কারণে তাঁদের ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে কিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র বা এলসি জটিলতার কারণে আমদানি করতে না পারায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার কথাও শুনানিতে উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়েছে। গণশুনানিতে ভোক্তা প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদেরা প্রশ্ন তোলেন, বাজারে যখন সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন নতুন করে কমিশন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কতটা যুক্তিসংগত। তাঁদের মতে, প্রথমে বাজারে নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধিরাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি ও অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের অভিযোগের যথাযথ সমাধান না হওয়ায় গণশুনানি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল দায়িত্বের একটি হলো ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। বাজারে ঘোষিত মূল্য কার্যকর না হলে শুধু নতুন দাম ঘোষণা করে সমস্যার সমাধান হবে না।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবও দাম না বাড়িয়ে প্রথমে বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নেওয়া বিইআরসির দায়িত্ব। বাজারে যখন নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে, তখন সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কমিশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারে ইচ্ছেমতো দামে এলপিজি বিক্রির পর আবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব আসছে। বাড়তি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে দ্রুত দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া ভোক্তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, এভাবে মূল্য বাড়ানো হলে জ্বালানি খাতে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ অবশ্য বলেছেন, শুনানিতে অংশ নেওয়া সব পক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য, নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ নিয়মিতই আসে, আবার কখনো কখনো নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে বিক্রির ঘটনাও রয়েছে। ২০২১ সালে নির্ধারিত কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও কমিশন বিবেচনা করছে।
এদিকে নভেম্বরের নিয়মিত মূল্য সমন্বয় সামনে থাকায় এলপিজির বাজারে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য ও জাহাজভাড়া বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার এবং অন্যান্য খরচও চূড়ান্ত মূল্যে প্রভাব ফেলবে। ফলে কমিশন বৃদ্ধি কার্যকর না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের কারণে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকছে।
সব মিলিয়ে এলপিজির বাজার এখন এমন একটি পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের বাড়তি ব্যয় ও কমিশন সমন্বয়ের দাবি করছেন, অন্যদিকে কোটি কোটি ভোক্তা নির্ধারিত দামে পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইছেন। রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কাছে বিষয়টি কেবল বাজারদরের হিসাব নয়; এটি সরাসরি মাসিক সংসার খরচের সঙ্গে যুক্ত।
তাই নতুন মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু আমদানি ও ব্যবসায়িক ব্যয় নয়, বাজারে প্রকৃত সরবরাহ, প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত দামে বিক্রির প্রবণতা, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। দাম বাড়ানো হলে তা যেন বাস্তবে বাজারে নির্ধারিত মূল্যে পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কাগজে নতুন মূল্য নির্ধারণ হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এলপিজি কেনার বাস্তব ব্যয় কমবে না; বরং আরও বাড়তে পারে। আগামী দিনের সিদ্ধান্ত তাই শুধু এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ করবে না, একই সঙ্গে জ্বালানি বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা এবং ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও নতুন করে সামনে আনবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত